
মুহাম্মদ জুবাইর
কল্পলোক আবাসিকে সাংবাদিক ফ্ল্যাট ব্লক নির্মাণে ভয়াবহ প্রতারণা,৬ জনের বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় মামলা

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিক এলাকায় সাংবাদিকদের জন্য নির্মিতব্য ফ্ল্যাট ব্লক নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতারণা ও চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সম্পাদক যীশু রায় চৌধুরী বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় এ মামলা করেন। মামলার নম্বর-৩০,তারিখ ২৭/০১/২৬।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,চট্টগ্রামে কর্মরত ৬৭ জন সাংবাদিকের আবাসনের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়।ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটির নাম জেনেসিস টেকনোলজিস্ট।চুক্তি অনুযায়ী,কল্পলোক আবাসিক এলাকায় ১৫ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের কথা ছিল।এর মধ্যে ৪তলা পর্যন্ত থাকবে কমার্শিয়াল ফ্লোর এবং বাকি তলাগুলোতে ৬৭ জন সাংবাদিকের জন্য ৬৭টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করার বাধ্যবাধকতা ছিল।

চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল,নির্ধারিত পাঁচ বছরের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে সাংবাদিকদের কাছে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে হবে।কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী,ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই নানা টালবাহানা শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তির শর্ত প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়,জেনেসিস টেকনোলজিস্ট মাত্র চার তলা পর্যন্ত আংশিক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে।এরপর হাউজিং সোসাইটির অনুমতি ও সম্মতি ছাড়াই চুক্তিবহির্ভূতভাবে প্রকল্পটি অন্য একটি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে দেয়।এতে করে পুরো প্রকল্পটি কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো,পাঁচ বছরের চুক্তি হলেও দীর্ঘ ১৬ বছর পার হয়ে গেলেও সাংবাদিকদের জন্য একটি ফ্ল্যাটও নির্মাণ করা হয়নি।বরং চুক্তির সু-স্পষ্ট শর্ত লঙ্ঘন করে নিচতলার ফ্লোরগুলো ওয়ার্কশপ ও গাড়ির গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়।একইভাবে কমার্শিয়াল ফ্লোরগুলোর দোকান একে একে ভাড়ায় দেওয়া হলেও সেই অর্থের কোনো অংশ সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির স্বার্থে ব্যবহার করা হয়নি।
এখানেই শেষ নয়।অভিযোগ রয়েছে,ডেভেলপার পক্ষ অবৈধভাবে সেখানে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার আয়োজন করে।এতে করে আবাসিক এলাকার পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়।পরে পুলিশ কমিশনারের হস্তক্ষেপে ওই অবৈধ মেলা বন্ধ করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুত ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় বুক বাঁধা সাংবাদিকদের জীবনে এই প্রকল্প এক গভীর হতাশার নাম হয়ে ওঠে।মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে করতেই ইতোমধ্যে ১০ জন সাংবাদিক মৃত্যুবরণ করেছেন,কিন্তু তবুও সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো বোধোদয় হয়নি।
সাংবাদিকদের অভিযোগ,এটি নিছক অবহেলা নয়,বরং একটি পরিকল্পিত প্রতারণা।বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকদের আবাসনের স্বপ্নকে পুঁজি করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করা হয়েছে।সাংবাদিক সমাজকে জিম্মি করে একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সম্পাদক যীশু রায় চৌধুরী আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।তিনি বলেন,আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি।কিন্তু প্রতিবারই আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে,তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না।
মামলায় অভিযুক্ত ছয়জন হলেন মোহাম্মদ মুছা,আবদুল্লাহ আল মামুন,মহসিন চৌধুরী,শিব্বির আহমদ রাশেদ,হাসিবুল করিম (জুয়েল)এবং গিয়াস উদ্দিন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।তারা বলছেন,সাংবাদিকদের মতো একটি পেশাজীবী শ্রেণিকে এভাবে প্রতারণার শিকার করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে এ ধরনের প্রতারণা আরও বাড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে মামলাটি তদন্তের জন্য বাকলিয়া থানা পুলিশ ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাংবাদিক নেতারা দাবি করেছেন,এই মামলাটি শুধু কয়েকজনের বিরুদ্ধে নয় এটি সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা,কষ্ট ও প্রতারণার বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ।তারা দ্রুত প্রকল্পটির বাস্তব সমাধান এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



