বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের উৎসবে চেতনায় বাঙ্গালী সংস্কৃতি উগ্রবাদ নয়, সম্প্রীতি

0
77

এজাজ রহমান: বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের উৎসবে চেতনায় বাঙ্গালী সংস্কৃতি উগ্রবাদ নয় সম্প্রতী নানা বাধাবিপত্তি ও আপত্তি সত্ত্বেও পহেলা বৈশাখের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে ঢাকাসহ সারাদেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। পোশাক, খাবার, সাজসজ্জা, অনুষ্ঠানমালা এমনকি মাছ-তরকারির বাজারসহ প্রায় সবকিছুতেই এখন বর্ষবরণের ছোঁয়া লাগে। তাই বংলা ও বঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যগুলোকে তুলে ধরার মহাসুযোগ সৃষ্টি হয়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, উদীচী, ঋষিজ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বিভিন্ন ক্লাব, করপোরেট প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলা নববর্ষকে মহাড়ম্বরে বরণ করে নেয়ার আয়োজন করে। এ উপলক্ষে বের করা হয় বর্ণিল মঙ্গল শোভাযাত্রা।

বাঙালির এই মহাজাগরণ দেখে চক্ষুজ্বালাসহ গায়ে জ্বর এসে যায় বিশেষ একটি মহলের। বাঙালির বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে তাদের কখনোই দেখা যায় না। বাংলায় কথাবলা, বাংলার জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা, থাকাখাওয়া ওই বিশেষ মহলটি আবার বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ঘোরবিরোধী। তাই বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধেও তারা অবস্থান নিয়েছিল।

মাতৃভাষা বাংলাকে বিদায় করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা স্বমহিমায় বেঁচে আছে। বাংলা ভাষার প্রধান কবি নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক সময় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানমালা ছিল পাকিস্তানের সংহতি বিরোধী। এতসব করেও তারা বঙালির জাগরণ ঠেকাতে পারেনি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে শতকরা ৮৯ ভাগ ভোট পেয়ে বাঙালির অবিসাংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।

হতবাক হয়ে গেলেও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখে সামরিক জান্তা। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদ, ৩ লাখ মা-বোনের ইজ্জত ও লাখো-কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আসে স্বাধীনতা। কিন্তু ষড়যন্ত্র থামে না। স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্টে ঘটে যায় মহাবিপর্যয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে কুচক্রিমহল। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় খুন-ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের দায়ে অভিযুক্ত পাকি দোসররা বেঁচে যায়। তারা এখনো এ দেশে পাকিদের হয়ে কাজ করছে। তারাই বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ পালনে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করছে।

১৯৭৬-এর ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইসলামী জলসায় স্লোগান ওঠে ‘তাওয়াব ভাই, তাওয়াব ভাই, চাঁদতারা পতাকা চাই।’ (ইত্তেফাক ৮ মার্চ ১৯৭৬)। সেদিনের উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও বিমাববাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তাওয়াবের বদান্যতায় ওই জলসায় জামায়াত-আলবদর-রাজাকারদের ছিল স্বাধীনতার পর প্রথম আত্মপ্রকাশ। ওই মজলিসে জামায়াতে ইসলামী ৬ দফা দাবি উত্থাপন করে।

দাবিগুলো হলো- দেশের পতাকা বদলাতে হবে, নতুন জাতীয় সঙ্গীত চাই, দেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে হবে, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনার ভেঙে দিতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের সময় নিহত রাজাকারদের স্মরণে মিনার নির্মাণ করতে হবে। ক্ষমতা দখলকারী জে. জিয়া ১৯৭৮ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছাঁটাই করেন। ধর্মের নামে দল গঠনের ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। ১৯৮৮ সালে আরেক সামরিক জান্তা জে. এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে প্রতিস্থাপন করেন- যা এখনো বলবৎ।

ইসলামের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ বরণের কোনো বিরোধ নেই। বর্ষবরণের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্কও নেই। এটা কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, ধর্মবিরোধীও নয়। ইসলামের সঙ্গে প্রকৃত বিরোধ তাদের যারা ইসলামের নামে ইসলামবিরোধী কাজ করেন। ইসলাম আজ আর শুধু আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে তা প্রতিপালন করে চলেছেন। কিন্তু তাই বলে তারা নিজস্ব জাতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যগুলো বিসর্জন দিয়ে নয়। ইরানিরা এখনো ঘটা করে নওরোজ উৎসব উদযাপন করেন।

সৌদিরা জাহেলিয়া যুগের অনেক আচার-আচারণ এখনো মেনে চলেন। ওকাজের ঐতিহ্যবাহী মেলা এখনো বসে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ মুসলমানপ্রধান দেশসমূহে ইসলাম আগমনের আগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসহ আচার-আচরণ এখনো বহাল আছে। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুযোগে ইসলামের নামে একটি বিশেষ মহল রাজনীতির ময়দানে হাজির হয়েছে। তারা আত্মসুদ্ধি ও সমাজসুদ্ধির বড় জেহাদ বাদ রেখে ক্ষমতা দখলের জেহাদে অবতীর্ণ হয়েছে। চিন্তায়, কথায় ও কাজের মধ্যে গড়পড় থাকলেও এক জায়গায় কিন্তু তাদের মধ্যে দারুণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেটা হলো পশ্চাৎপদতা। তারা আধুনিক জগৎ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পিছিয়ে পড়েছেন। এরপরও তারা পেছনে পড়া মতাদর্শের সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার জেহাদ করে চলেছেন।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক বাংলা নববর্ষবরণ হলো বাঙালির প্রধান উৎসব। এই উৎসব বন্ধ ও উৎসব বোনাস বন্ধের দাবির মধ্যেই উৎকট সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। ইসলাম ধর্মে সাম্প্রদায়িকতার কোনো প্রশ্রয় নেই। অথচ ইসলামের নামেই এসব করা হচ্ছে। যেসব বিষয়ের সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই, সেসব বিষয়ের সঙ্গে কল্পিত বিরোধ লাগিয়ে ইসলামকে ছোট করে ফেলছে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ ছিল না। অথচ ইসলামের নামেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের জারজ সন্তান, ভারতের চর বলা হয়েছে।

বলা অসঙ্গত হবে না যে, শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এত অনাচার, অবিচার, জালিয়াতি, মাদকাসক্তি, খুনহত্যা, ধর্ষণ, রাহাজানি, দুর্নীতি, লুটপাট, শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য এক কথায় অধর্ম কারা করছে। যে দেশে নগণ্যসংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া কারো মধ্যে সততা, নৈতিকতা, মানবতা, সহমর্মিতা, মননশীলতা, সহনশীলতা এক কথায় ধর্মীয় মূল্যবোধ নেই, সে দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এ দেশের এক শ্রেণির মুসলমান ইসলামকে রাজনীতি, জেহাদ, খুনহত্যা ও অনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যারা বিরোধী, তারা নিঃসন্দেহে সংকীর্ণমনা, হীন রাজনৈতিক স্বার্থে বিভোর, ধর্মসাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী। এদের মধ্য থেকেই বর্ষবরণের অনুষ্ঠান পণ্ড করার জন্য গুণ্ডারা বেরিয়ে আসে। এদের সংখ্য খুব বেশি নয়। সরকারের আপস ফর্মলা তাদের আশকারা দিয়ে চলেছে। তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা প্রয়োজন। সারা পৃথিবীর একশ্রেণির মুসলমানের এই উগ্রবাদী আচরণ ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে।

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত কোনো পথ খোলা নেই। এ অবস্থায় এর নিষ্পত্তিও সম্ভব নয়। এ জন্য জ্ঞানবিজ্ঞানে মুসলমানদের আরো উন্নতি লাভ করতে হবে, সচেতন হয়ে উঠতে হবে, ইসলামের দীক্ষানুসারে ধৈর্যশীল, সহনশীল, মননশীল ও উদার হতে হবে। তারপর সমবেতভাবে মুসলমানদেরই সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠতে হবে।

 

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

15 − 15 =