সোনারগাঁয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে ১৫০ কোটি টাকা হরিলুট

0
28

মো: আহসানউল্লাহ হাসান: ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন আবাসিক গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে, তখন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা প্রতিটি বাড়ীতেই চলছে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের মহোৎসব। আর এতে সরকার বছরে রাজস্ব হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন দলীয় নেতাকর্মীরা বিনা পয়সায় গ্যাস ব্যবহার করলেও সাধারন জনগন গ্যাস চোর সিন্ডিকেটের সদস্যদের সাথে লিয়াজো করে টাকার বিনিময়েই পুড়ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস। সোনারগাঁ উপজেলায় বিগত তিন বছরে অবৈধ গ্যাস দিয়ে এবং উক্ত গ্যাসের বিল আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে গ্যাস চোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা অন্তত ১৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোনারগাঁ উপজেলার পৌরসভা অংশ বাদ দিলে অবশিষ্ট ১০টি ইউনিয়ন রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি চেয়ারম্যান, মেম্বার, সরকার দলীয় নেতাকর্মী সহ প্রত্যেকটি সাধারন মানুষের বাড়ীতেই রয়েছে অবৈধ গ্যাসের সংযোগ। প্রতিটি বাড়ীতে গড়ে দুইটি করে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। এই হিসেবে সোনারগায়ের ১০ ইউনিয়নে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার অবৈধ গ্যাসের চুলা রয়েছে।

সরকারী হিসেবে প্রতিটি গ্যাসের চুলার মাসিক বিল নুন্যতম ৯শ ৭৫ টাকা হলে প্রতি মাসে গ্যাস বিল বাবদ ২ কোটি থেকে আড়াই কোটি টাকা সরকারী কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা বিনা পয়সায় এই গ্যাস জ্বালালেও তারাই আবার গ্যাস অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে সাধারান জনগনের নিকট থেকে প্রতি মাসে গ্যাস বিল বাবদ কোটি কোটি টাকা আদায় করে নিজেদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করে নিচ্ছে। এভাবে বিগত তিন বছরের হিসাব দেখলে সহজেই বুঝা যায় গ্যাস চোর সিন্ডিকেট সদস্যরা তিতাসের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই নিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষেরও যেন কোন মাথা ব্যথাই নেই।  নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাসের সোনারগাঁ কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানায়, পৌরসভা ব্যতীত সোনারগায়ের প্রতি বাড়ীতেই অবৈধ গ্যাসের সংযোগ রয়েছে।

মেম্বার, চেয়ারম্যান, সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও গ্যাস অফিসের কর্মকর্তারা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে অবৈধ ভাবে এই গ্যাস সংযোগ গুলো প্রদান করেছে। প্রতিটি সংযোগ দেয়ার সময় এককালীন হাতিয়ে নিয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানকারী সিন্ডিকেটটি প্রথম অবস্থায় গ্যাস সংযোগ দিয়েই হাতিয়ে নিয়েছে শত কোটি টাকা। মাঝে মধ্যে গ্যাস অফিসের লোকজনেরা অভিযান চালিয়ে দিনের বেলা দুইচারটি অবৈধ গ্যাস লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও রাতে বেলাই ঐ সংযোগ চালু করেছে গ্যাস চোর সিন্ডিকেটের লোকজনেরা। সরকার অনুমোদিত এলাকা ছাড়া সোনারগায়ের ১০ ইউনিয়নে কিভাবে হাজার হাজার গ্রাহক গ্যাস ব্যবহার করে এটাই এখন রহস্যময় প্রশ্ন।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সোনারগাঁর পৌর এলাকা ছাড়া ১০টি ইউনিয়নের সবগুলো গ্রামেই রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জানান, গত তিন বছরে উপজেলার অধিকাংশ গ্রামেই গ্যাসের অবৈধ সংযোগ পৌঁছে গেছে। মাঝে কিছু সংযোগ বিচ্ছিন্নও করা হলেও পুনরায় তা চালু করা হয়েছে। লোকবলের সংকট দেখিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষ এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করে না। তবে তিতাস কর্তৃপক্ষের উল্টো অভিযোগ করে বলে, অবৈধ এসব গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত আছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তাঁদের কারণেই উচ্ছেদ অভিযান সফল হয় না।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার আনন্দবাজার-বারদী সড়কের ছনপাড়া সেতুর কাছে সড়ক কেটে গ্যাসের পাইপ বসানোর কাজ শুরু করে বারদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক ও সাবেক মেম্বার রফিকুল ইসলামের লোকজন। এ জন্য গ্রাহক প্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। ফুলদী গ্রামের বাসিন্দা আলী আজগর বলেন, ‘গ্যাস-সংযোগ নিতে আমরা গ্রাহক প্রতি ইতিমধ্যে ৪৫ হাজার টাকা করে দিয়েছি।’

অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারে বারদী এলাকার সাবেক মেম্বার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার সর্বত্র এরই মধ্যে গ্যাস পৌঁছে গেছে। তাই আমরাও গ্যাস নিয়েছি। যেহেতু সরকার কাউকে বাধা দেয়নি, তাই সবার যা গতি হয়, আমাদেরও তা-ই হবে।’

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সোনারগাঁ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি জড়িত। জনবলসংকট ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা না থাকায় আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছি না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে জনপ্রতিনিধিরা জনগনের সাথে সম্মিলিতভাবে আমাদেরকে ধাওয়া করে।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

fifteen − 12 =