মাদক ব্যবসাসহ শতাধিক অভিযোগ ঃ ডিবির দারোগা ইকবালের বিরুদ্ধে তার কুটির জোর কোথায়.?

0
183

স্টাফ রিপোর্টার: হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইকবাল বাহারের কুঠির জোর কোথায়.? একের পর এক অপকর্ম করেও বার বারই পার পেয়ে যাচ্ছে হবিগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই ইকবাল বাহার। মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, মামলার ভয় দেখিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়, মোটর সাইকেল চুরি, বিভিন্ন থানার ওসিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই সব থানা এলাকায় নিজস্ব লোক দিয়ে চুরি, ডাকাতি করানো, ব্যবসায়ীর ছেলেকে মোটর সাইকেল চুরির মামলায় ফাসিঁয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ২ লাখ টাকা চাদা দাবীসহ শতাধিক অভিযোগ রয়েছে এসআই ইকবাল বাহারসহ তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর একই কর্মস্থলে চাকুরি করার ফলে তিনি নিজেই সমগ্র জেলায় তৈরী করে নিয়েছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। তাঁর এক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মাদক আমদানি পাচার। এক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ভারতীয় শাড়ী, ত্রি-পিছ, জিরা, গাড়ীর টায়ার ও চা-পাতা আমদানী ও পাচার। অপর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রনে বিভিন্ন মামলায় আসামী করা ও মামলা থেকে নাম কর্তনের কথা বলে টাকা আদায়। আর সে নিজে বিভিন্ন ব্যক্তিকে মাদক মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় ফাসিঁয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়। এসব অপকর্ম করে তিনি অল্প দিনেই আঙ্গুল ফুলে কলা গাছে পরিনত হয়েছেন।

জানা যায়, এসআই ইকবাল বাহার গত ১৮ আগস্ট হবিগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় বদলীর হয়ে সিসি গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি সুনামগঞ্জে যোগদান না করে আরেক এসআই ও ডিবির এক কথিত সোর্সকে সাথে নিয়ে গত ২১ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে হবিগঞ্জ শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ভিশন ইলেকট্রনিক্স এর মালিক সাবেক সেনা সদস্য মালিক আব্দুল হাকিম ফুল মিয়ার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাঁর ছেলে মোঃ আরিফকে মোটর সাইকেল চুরি/মাদক মামলায় ফাসাঁনোর ভয় দেখিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করেন।

একই সাথে তখন সে ওই ব্যসায়ীকে ভয় দেখিয়ে হুমকি দিয়ে বলে আমিতো হবিগঞ্জ থেকে চলে যাব, টাকা না দিলে তখন বুঝবি কোর্টে কতদিন দৌড়তে পারিস। তিনি বের হয়ে যাওয়ার পর পরই ডিবি পুলিশের চিহ্নিত সোর্স শরীফ তার মোবাইল নম্বর ০১৭৪৮-৪৯৮০০৯ থেকে আব্দুল হাকিমের মোবাইল নম্বর ০১৭১২-৭৮৩৪৩১ এ ফোন করে ডিবির সোর্স পরিচয় দিয়ে বলে যে, স্যার যা দাবী করছেন তার থেকে ৫০ হাজার কম দিয়ে দিড় লাখ টাকা দিয়ে দেন, না দিলে আপনি সহ আপনার ছেলেরা বিপদে পড়বে।

আর এতেই ঘটে যায় সকল বিপত্তি। আর এতে করেই বেড়িয়ে আসতে থাকে দারোগা ইকবালসহ তার সিন্ডিকেটের সকল অপকর্মের ফিরিস্তী। উক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে ইকবাল ও সোর্স এর সকল ভিডিও চিত্র। ওই ভিডিও চিত্রের একটি কপিও পৌছে আমাদের হাতে। একই সাথে মোবাইলের কললিস্ট পর্যালোচনা করলেও পাওয়া যাবে এর সত্যতা। বিষয়টি তাৎক্ষনিক ওই ব্যবসায়ী হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে অবগত করেন।

এদিকে গত ১৬ আগস্ট দারোগা ইকবালের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার দীঘলবাগ গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদের পুত্র জয়নাল আবেদীনকে ভূয়া মামলা দিয়ে ফাসাঁনোর অভিযোগে পুলিশ সুপার বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগটি তদন্ত করার জন্য হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম ফজলুল হককে দায়িত্ব দেয়া হয়। যদিও ইকবাল ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অভিযোগের তদন্ত রিপোর্টটি তার পক্ষে নিয়ে নেয় বলে জানা গেছে।

একাধিক নির্বরযোগ্য সুত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এসআই ইকবাল বাহারের রয়েছে ৪টি প্রাইভেট কার, কয়েকটি মোটর সাইকেল, নামে বে-নামে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। নিজ এলাকা কুষ্টিয়ায় গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ি ও কয়েক একর জমি।

এত কিছুর পরেও তিনি কিভাবে সকল অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশসহ সাধারণ মানুষের মাঝে। সবারই এখন একই কথা এসআই ইকবাল বাহারের কুঠির জোর কোথায়.? তবে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির আপন ভাতিজা পরিচয় দিয়ে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন সর্বত্র। আর ওই অতিরিক্ত ডিআইজির ভয়ে তার বিরুদ্ধে কার্যত কোন ব্যবস্থাও নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, দারোগা ইকবাল বাহার হবিগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখায় যোগদান করার পর থেকেই বিভিন্ন উপজেলায় নিজেস্ব লোকজন তৈরী করেন। আর ওই সকল লোক দিয়ে মাদক ব্যবসাসহ সকল অপকর্ম পরিচালনা করে আসছেন।

এদিকে একটি নির্বরযোগ্য সুত্র জানায়, যোগদানের পর পরই মাধবপুর উপজেলা ছাত্রলীগের এক নেতা ও যুবলীগের নেতাকে বিপুল পরিমান ইয়াবাসহ আটক করেন। পরে ওই উপজেলার এক শীর্ষ আওয়ামীলীগ ও যুবলীগ নেতার মধ্যস্থতায় ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

একই সাথে ৪০ হাজার টাকা করে মাসোহারা দিয়ে তাদের মাদক ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দেয়া হয়। মাধবপুর থানার ছাতিয়াইন এলাকার মাদক সম্রাট আক্তার হোসেন এর কাছ থেকে প্রতিমাসে ৫৫ হাজার টাকা মাসোহারা আদায় করে এসআই ইকবালসহ তার সিন্ডিকেট।

চলতি বছরের ১৫ মে রাত সাড়ে ১১ টার দিকে মাধবপুর থানার বাঘাসুরা এলাকার জেএস ট্রান্সপোর্ট (হযরত শাহজালাল রহঃ হোটেল এর পাশ থেকে রিয়াজনগর গ্রামের পাভেল মিয়ার পকেটে ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দিয়ে এক লাখ টাকা আদায় করে ডিবির একটি টিম ঘটনাস্থলেই ছেড়ে দেয়। বিষয়টি স্থানীয় মেম্বারসহ অনেকেই অবগত হন।

এবং তারা সবাই তাৎক্ষনিক এর প্রতিবাদ করলে এসআই ইকবাল বাহার ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেয়ার হুমকি দেন। অন্যদিকে প্রতিমাসে ১ এক লাখ টাকা করে মাসোয়ারা নেয়ার বিনিময়ে তাদের বদলীসহ সব কিছু দেখা শোনা করেন হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে কর্মরত এক পুলিশ ইন্সপেক্টর। আর এর বিনিময়ে বিভিন্ন কৌশলে তাঁর মনোনীত লোকজন একইস্থানে ৪/৫ বছর থেকে নিশ্চিন্তে লাগামহীণ দূর্নীতি করে যাচ্ছে।

শত অভিযোগের পরও তাদেরকে তাদের কর্মস্থল থেকে বদলী করা হয় না। মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা-বাগন ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় ওই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনে মাদক দ্রব্য দেশে প্রবেশ করে। যার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের সিনিয়র কয়েকজন উপ-পরিদর্শক। অভিযোগ রয়েছে গত রোজার ঈদের ৫ দিন পূর্বে মাধবপুর থানার শাহজিবাজার থেকে ২ চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে ২১ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ একটি সিএনজি গাড়ী আটক করে তাদের টিম।

পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মাত্র ১৩শ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে তাদের চালান দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পূর্বে হবিগঞ্জ সদর থানার টঙ্গীরঘাটের আফছর উদ্দিন এর সহযোগীতায় টেকনাফের “আলী”কে ৮ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করে এসআই ইকবাল বাহারের শহরের মাহমুদাবাদের ভাড়া বাসায় আটক রেখে নির্যাতন চালানো হয়। দৈহিক নির্যাতনের ৯ দিনের মাথায় তাঁর কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় করে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেয় ইকবালসহ তার সহযোগীরা।

এছাড়াও মাধবপুর থানার নোয়াপাড়ার মাদক ব্যবসায়ী জুয়েল এর কাছ থেকে প্রতিমাসে ২৫ হাজার টাকা করে মাসোহারা নিয়ে তাকে দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে দারোগা ইকবালের সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে এসআই ইকবাল, আজাদ ও আব্দুল করিম হবিগঞ্জ শহরের সিনেমা হল রোডসহ শহরের বিভিন্ন হোটেলে অসামাজিক কাজের সুযোগ করে দিয়ে প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা মাসোহারা আদায় করে। সম্প্রতি একজন সুনামগঞ্জে বদলী হয়ে যাওয়ায় তাদের সিন্ডিকেটের শক্তি একটু কমে আসে।

অবৈধ উপায়ে অর্জিত হবিগঞ্জ ডিবি’র ইকবালের রয়েছে ৩টি প্রাইভেটকার। এর মধ্যে ২টি সাদা ও ১টি প্রিমিও নতুন মডেল এবং আরওয়ান ফাইভ, সুজুকি জিক্সার ও পালসারসহ তাঁর রয়েছে ৪টি মোটর সাইকেল। এর মধ্যে শুধু মাত্র একটি গাড়ীর রয়েছে রেজিষ্ট্রেশন। যার নাম্বার (ঢাকা মেট্রো গ-১২-৩০২৯ (এলএক্স ১০০ সাদা)।

এদিকে একটি বিশ্বস্ত সুত্রে জানা যায়, এসআই ইকবালের ব্যবহৃত প্রিমিও গাড়ীটি শ্রীমঙ্গলের আওয়ামীলীগের সু-পরিচিত ৬নং ভূনবীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান চেরাগ আলী এর ছেলে ফয়সলকে মাদক মামলা ও চোরাই মোটর সাইকেল পাচারের মামলায় ১নং আসামী থেকে সরিয়ে ৫ নম্বরে নেওয়ার বিনিময়ে চেয়ারম্যান ওই গাড়ীটি উপহার সরূপ প্রদান করেন।

অপর একটি সুত্র জানায়, এসআই ইকবালের বিভিন্নভাবে আটককৃত মাদক দ্রব্য বিক্রয়ের জন্যও রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

শহরের উমেদনগরে মাদক বিক্রির জন্য বাবুল, ওই এলাকার নদীর পাড়ে মাদক বিক্রির জন্য জয়নাল, পৌর ঘাটলা বলে পরিচিত এলাকায় মাদক বিক্রির জন্য ইদ্রীস, পোদ্দার বাড়ি এলাকায় গাউছিয়া মাদ্রাসার পেছনে নদীর পাড়ে মাদক বিক্রির জন্য নোমান, মাছুলিয়া ব্রীজের পাশে বিক্রির জন্য আলী, বাহুবলে উপজেলার আশপাশ এলাকায় মাদক বিক্রির জন্য জয়নুল, নাসিরনগরের ধরমন্ডলে শাহ আলম, চুনারুঘাটের বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির জন্য শহীদ, জামাল, ফজল, মাধবপুর উপজেলায় আকবর, জয়নালসহ প্রায় প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে তার নিজেস্ব কিছু মাদক বিক্রেতা।

এ ব্যাপারে এসআই ইকবাল বাহারের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিক বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা (বিপিএম-পিপিএম) বলেন, ব্যবসায়ীর সাথে একটি সমস্যা হয়েছে সেটি আমি শোনেছি। এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া ওই তিন জনের মধ্যে দু’জন অন্যত্র বদলী হয়ে চলে গেছেন।

এ ব্যাপারে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ কামরুল হাসান বিপিএম-পিপিএম বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার পরেও আমি খোজ নিয়ে দেখবো। যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে অব্যশই তদন্তপুর্বক তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। ব্যক্তির অপরাধের শাস্তি ব্যক্তিই পাবে। তার জন্য পুরো পুলিশ বাহিনী দায় নেবে না।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

12 + 7 =