হাশরে সৎ আমলই মুমিনের সঙ্গী

0
87

‘ওয়ামা খলফাহুম ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইম মিন ইলমিহি ইলস্না বিমা শাআ ওয়াসিয়া কুরসিয়ু্যহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্‌ ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলিয়ু্যল আজিম।’ ভয়ানক কঠিন রোজ হাশরের ময়দানে যখন সব মানুষ তার স্ব-স্ব বিচারের প্রতীক্ষা করতে থাকবে, সেদিনের সেই উন্মুক্ত ময়দানে কোনো সামিয়ানা থাকবে না, থাকবে না কোনো সাহায্যকারী। এমনকি কোনো বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীরও দেখা মিলবে না। এ সময় শুধুমাত্র দুনিয়ায় করে যাওয়া সৎ আমলই মুমিনের সঙ্গী হবে। সেই আমলের বিনিময়ে মহান আলস্নাহ প্রাথমিক পুরষ্কার হিসাবে দান করবেন তার ‘আরশে আজিমের’ ছায়া। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুলস্নাহ (স.) বলেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আলস্নাহ তায়ালা হাশরের ময়দানে নিজের আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। যখন তা ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।

যারা ছায়াতলে স্থান পাবেন তারা হলেন, (১) মুসলমানদের সুবিচারক ও ইনসাফগার শাসক ও বাদশা। (২) সেই যুবক যে আলস্নাহ তায়ালার বন্দেগিতে জীবন অতিবাহিত করেছেন। (৩) যে ব্যক্তির অন্তর মাসজিদ থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় মসজিদে প্রবেশ না করা পর্যন্ত মসজিদের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট

থাকে। অর্থাৎ তার অন্তর থাকে মসজিদে, দেহ থাকে বাইরে। (৪) যে দু’ব্যক্তি আলস্নাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসেন এবং সেই মহব্বতের জন্যই তারা একত্রিত হন। এবং সেই মহব্বতের কথা স্মরণ রেখেই পরস্পর থেকে পৃথক হন। (৫) যে ব্যক্তি নিভৃতে একাকী অবস্থায় আলস্নাহর জিকির করে এবং তার ভয়ে নয়নযুগল হতে অশ্রম্ন প্রবাহিত হয়। (৬) যে ব্যক্তিকে কোনো পরমাসুন্দরী ও অভিজাত শ্রেণির মহিলা ব্যভিচারের জন্য আহ্বান জানালে সে সুস্পষ্টভাবে এ জওয়াব দেয় যে, আমি আলস্নাহ তায়ালাকে ভয় করি। (৭) যে ব্যক্তি এমন সংগোপনে দান করে যে, তার বাম হাত জানে না তার ডান হাত কী দান করেছে।

কিয়ামতের ব্যাপারে যারা সন্দেহ করে তাদের উদ্দেশে আলস্নাহ তায়ালা বলেন- যখন সেই সংঘটিত হবার ঘটনাটি হয়েই যাবে, তখন তার সংঘটনের ব্যাপারে মিথ্যা বলার মতো কেউ থাকবে না। (সুরা ওয়াকিয়াহ্‌? : ১-২)

সব কিছুই মুহূর্তে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে সেদিন, পার্থিব কোনো কিছুই টিকে থাকবে না। শুধু টিকে থাকবে মহান আলস্নাহর আরশে আজিম। তাঁর চিরঞ্জীব সত্তা ব্যতীত অন্য কোনো কিছুই টিকে থাকবে না। মহান আলাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে শুধু টিকে থাকবে তোমার মহীয়ান-গরীয়ান রবের মহান সত্তা। (সুরা রাহমান : ২৭)

সৃষ্টি জগতের ধ্বংস, নতুন জগৎ সৃষ্টি ও মানুষের পুনর্জীবন লাভ- সবই আলস্নাহর মহান পরিকল্পনা ও কর্মসূচির আওতাভুক্ত। মহাধ্বংসযজ্ঞ শুরু করার জন্য ফেরেশতা হজরত ইসরাফিল আলাইহিস সালাম সিঙ্গা মুখের কাছে ধরে আরশে আজিমের দিকে আগ্রহে তাকিয়ে আছেন, কোন মুহূর্তে আলস্নাহ আদেশ দান করবেন।

মহান আলস্নাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, (তাদেরকে সেদিনের ভয় দেখাও) যেদিন যমিন আসমানকে পরিবর্তন করে অন্যরূপ দেওয়া হবে। তারপর সবাইকেই মহাপরাক্রান্তশালী এক আলস্নাহর সামনে হাতে-পায়ে শিকল পরা এবং আরামহীন অবস্থায় হাজির করা হবে। সেদিন তোমরা পাপীদের দেখবে আলকাতরার পোশাক পরিধান করে আছে আর আগুনের লেলিহান শিখা তাদের মুখমন্ডলের উপর ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। এটা এ জন্যে হবে যে, আলস্নাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের বিনিময় দেবেন। আলস্নাহর হিসাব গ্রহণ করতে বিলম্ব হয় না। (সুরা ইবরাহিম : ৪৮-৫১)

গভীরভাবে কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন করলে অনুমান করা যায় যে, কিয়ামতের দিন বর্তমানের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার অবসান ঘটিয়ে নতুন এক জগৎ মহান আলস্নাহ প্রস্তুত করবেন। সে জগতের নামই পরকাল বা পরজগৎ। সে জগতের জন্যও নিয়ম-কানুন রচনা করা হবে। তারপর তৃতীয়বার সিঙায় ফুঁক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত মৃতু্যবরণকারী সব মানুষ পুনর্জীবন লাভ করে আলস্নাহর সামনে উপস্থিত হবে। এই উপস্থিত হওয়াকেই কোরআনে হাশর বলা হয়েছে। হাশর শব্দের অর্থ হলো চারদিক থেকে গুটিয়ে একস্থানে সমাবেশ করা।

আলস্নাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, পৃথিবীটা তখন হঠাৎ করেই কাঁপিয়ে দেওয়া হবে। (সুরা ওয়াকিয়াহ্‌ : ৪)

কিয়ামতের দিন প্রচন্ড ভূমিকম্প হবে। এ ভূমিকম্পের কম্পনের মাত্রা যে কত ভয়ংকর হবে তা অনুমান করা কঠিন। পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় ভূমিকম্প হবে না; বরং গোটা পৃথিবীজুড়ে একই সময়ে হবে। হঠাৎ করেই পৃথিবীটাকে ধাক্কা দেওয়া হবে। ফলে পৃথিবী ভয়াবহভাবে কাঁপতে থাকবে। সেদিন মহাশূন্যে পাহাড় উড়বে। আল কোরআন ঘোষণা করছে, পৃথিবী সৃষ্টির পরে তা কাঁপতে থাকে, পরে পাহাড় সৃষ্টি করে মধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা পেরেকের মতো পৃথিবীতে বসিয়ে দেওয়া হয়। পৃথিবী তখন স্থির হয়। কিন্তু কিয়ামতের দিন মধ্যাকর্ষণ শক্তি আলস্নাহ উঠিয়ে নেবেন। ফলে পাহাড়সমূহ উড়তে থাকবে অর্থাৎ মহাশূন্যে ভেসে বেড়াবে।

মহান আলস্নাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন সম্পর্কে বলেন- তোমরা অপেক্ষা করো সেই দিনের যখন আকাশ-মন্ডল ধোঁয়া নিয়ে আসবে। তা মানুষদের উপর আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। এটা হলো পীড়াদায়ক আজাব। (সুরা দুখান)

সেদিন আকাশ দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যাবে। অসংখ্য তারকামালাখচিত সৌন্দর্য-মন্ডিত আসমান বর্তমান অবস্থায় থাকবে না। আলাহ তায়ালা বলেন, যখন আকাশ-মন্ডল ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। (সুরা ইনফিতার : ১)

সেদিন এমন ভায়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করা হবে যে, ভয়ে-আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় অল্প বয়স্ক বালকগুলোকে বৃদ্ধের মতো দেখা যাবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- তাহলে সেদিন কীভাবে রক্ষা পাবে যেদিন বালকদের বৃদ্ধ বানিয়ে দেওয়া হবে। এবং যার কঠোরতায় আকাশ দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যাবে। আর ওয়াদা তো অবশ্যই পূর্ণ করা হবে। (সুরা মুজজাম্মিল : ১৭-১৮)

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × two =