১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধে স্মরণীয় ঘটনার বিবরণ বিজয় মাস উপলক্ষ্যে প্রকাশ

0
132

কিউরেটর, অর্কাইড এন্ড ডিসপ্লে প্লট: এফ-১১/এ-বি, সিভিক সেক্টর, আগারগাঁও, শের-এ-বাংলানগর, ঢাকা-১২০৭, বাংলাদেশ। ১) মুক্তিযোদ্ধার নাম-বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আওয়াল মিয়া ,২) জন্ম তারিখ: ০২/০১/১৯৫৪ ইং, ৩) পশ্চিম বাংলা বর্ধমান জেলা ভারনপুর টাটা কোম্পানী কলোনী, ৪) মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স কত ছিল ১৭ বছর ২ মাস।, ৫) বর্তমান ঠিকানা :  গ্রাম: উত্তর বাহের চর, ডাকঘর: তারানগর, থানা: কেরানীগঞ্জ, জেলা: ঢাকা।, ৬) স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: শ্রীরামপুর, ডাকঘর: শ্রীরামপুর, উপজেলা: নবীনগর, জেলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া।, ৭) মুক্তিযুদ্ধের সময় কত নং সেক্টরের অধীন যুদ্ধ করেছিলেন: ২নং সেক্টর অধীন।, ৮) শিক্ষাগত যোগ্যতা : ৮ম শ্রেণি।, ৯) ট্রেনিং-এর বিবরণ:

১৬ই মে ১৯৭১ সালে বুড়ি নদীতে যুদ্ধকালীন সময়ে প্রবাসী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহম্মেদ এর পরিবার জহুরা তাজউদ্দিন তার ছেলে মেয়ে সহ বুড়ি নদীতে আটক রাজাকার বাহিনীর কাছে আটক হয়েছে বলে আমাদের কে জানান, তখন ঐখানে আমরা ফুটবল খেলতে ছিলাম এবং আরো জানান যে আওয়ামীলীগের একজন বড় নেতার পরিবারকে আটক করেছে। তখন আমরা সবাই ঐখানে গিয়ে প্রবাসী প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে উদ্ধার করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নিয়ে আগরতলার কংগ্রেস ভবনে নিয়ে যাই।

আমরা ১৯৭১ সালে ২০ মে ত্রিপুরা রাজ্যে আগরতলা কংগ্রেস ভবনে ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিন সাহেবের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীতে অংশগ্রহণ করি। সেখান থেকে আমাদেরকে ট্রের্নিং দেওয়ার জন্য আসাম রাজ্যের কাছার জেলার করিমগঞ্জ থানার করীমগঞ্জ অধীন লোহার বন ভারতীয় সেনা ক্যান্টনমেন্টের অস্থায়ী ক্যাম্পে।

আসাম রাজ্যে লোহার বনে ট্রেনিং সেন্টারে আমাদেরকে ০১ লা জুন হইতে ২৫ জুলাই পর্যন্ত, ১৯৭১ ইং তারিখে অস্ত্র প্রশিক্ষন শেষ করি। ট্রেনিং সেন্টার হইতে তিন কিলোমিটার দূরে শালবাগানে আমরা পায়ে হেটে চানমারি করতে যেতাম, এই সময় আমাদের সাথে ২০শে জুন, ১৯৭১ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা আক্তার হোসেন সরকার যেখানে চানমারি করিয়া একটি গাছের সাথে অস্ত্র রেখে চলে আসে।

তখন রাত ১০:০০ রোল কলের সময় আমাদের দার করিয়ে বলে একটি অস্ত্র নেই। তখন আমরা ভয়ে কেউ স্বীকার করি না। তখন আমাকে আক্তার হোসেন সরকার বলে যেখানে গুলি করেছি, তার পাশে একটি শাল গাছের সাথে অস্ত্রটি রেখে এসেছি, বিষয়টি আমরা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সুবেদার মেজর আব্দুল ওহাব সাহেবকে জানাই। উনি সেখানকার মেজর প্রেমসিং কে জানায়, ক্যাম্প ইনচার্জ ভারতের সেনাবাহিনীর মেজর প্রেমসিং কে জানালে উনি আমাদেরকে সাজা না দিয়ে আক্তার হোসেনকে ক্ষমা করে দেন এবং অস্ত্রটি আনার জন্য বলে।

তারপর আমাদেরকে বলে আক্তার হোসেন সরকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা তপন চক্রবর্তী, তার গ্রামের বাড়ী নবীনগর সদর, আমরা ০৩ জন সেখান থেকে শাল বাগান হইতে সেনা ক্যান্টনমেন্টে অস্থায়ী ক্যাম্পে অস্ত্রটি আনিয়া জমা দেই। তারপর বীরমুক্তিযোদ্ধা, আক্তার হোসেন (বর্তমানে মৃত) এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা তপন চক্রবর্তী তারা দুই জন ৩নং সেক্টরের অধীনে আমি ২য় সেক্টরে অধীনে চলে আসি।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে ২ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশারফ সাহেব আমরা ২ নং সেক্টরের সাফসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন গাফ্ফার সাহেবের সাথে ফোর বেঙ্গল বি-কোম্পানীর সাথে কোনাবন ক্যাম্পে ৩০/০৭/১৯৭১ ইং সালে যুদ্ধে যোগদান করি।

১০) মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখ্যযোগ্য অপারেশন সমূহের কি কি এবং বর্ণনা। ১লা অক্টোবর থেকে ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত আমরা সালদা নদী এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য বাংকার খনন করি। ১৫ইং অক্টোবর, ১৯৭১ সালে কোনাবন ক্যাম্পের একটি নাটকীয় ঐতিহাসিক স্মরনীয় ঘটনার বর্ণনা জানাই কোনাবনে প্রচন্ড বানরের চলাচল ছিল আমি এবং মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস মিয়া একটি বানরের বাচ্চা ধরে নিয়ে আসি,

আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রামের সময় প্রায় শতাধিক বানর আমাদের ক্যাম্পে আক্রমণ চালায় তখন ক্যাপ্টেন গাফ্ফার সাহেব জরুরি বাশি বাজিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করেন এত বানর কেন আক্রমন করল তখন আমি একটি বাচ্ছা ধরে নিয়ে এসেছি বলার পর বানরের বাচ্চাটাকে গাফ্ফার সাহেব ছেড়ে দিতে বলে, আমি বানরের বাচ্চাকে ছেড়ে দেই এবং বানরের বাচ্চা নিয়ে বানরের দল চলে যায়।

অপারেশন সমূহ: সালদা নদী (৩০ শে অক্টোবর)

সালদা নদী: সালদা নদীতে সাব সেক্টর কমান্ডার গাফ্ফার সাহেব ও প্লাটন কমান্ডার সেনাবাহিনী হাবিলদার মাসুদ সাহেব এর নেতৃত্বে আমরা রাতদিন সর্বমোট ১৩ দিন সম্মুখযুদ্ধ চলাকালীন সময় ৫৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ১৩ দিন পর সালদা নদী ছেড়ে কসবা থানার ইমাম বাড়ীর জমিদার বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। এরপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ১৮ জন সৈনিক মৃত্যু বরণ করে এবং ১১/১১/১৯৭১ইং তারিখে ১৭০ জন হানাদার বাহিনী গাফ্ফার সাহেবের নিকট আত্ম সমর্পন করে পরে’

কোনাবন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ভারতে মিত্র বাহিনীদের নিকট পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ১৭০ জনকে বুঝিয়ে দেই। ১৩/১১/১৯৭১ইং কসবা থানার কোল্লা পাথর এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান আবুতাহের সরকার সাহেবের অর্থায়নে কাফনের কাপড়সহ উনার জমির উপর ৫৩ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দাফন করা হয়।

১৫ই নভেম্বর  তোফাজ্জল হোসেন টি আলী পাকিস্তানে তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রী ছিলেন তার বাড়ীতে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল এবং সেখান থেকে কসবা থানার বিভিন্ন গ্রামে যুদ্ধ পরিচালনা করতো ওই মেজর। তাহার বাড়ীর উত্তর পাশের্^ ৩ রাস্তার মাথায় আর্টিলারি বসিয়ে লত্তামোড়া এলাকা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প আক্রমন চালিয়ে সেখানে ইপিআর বাহিনীর সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ১৯ জন শহীন হন।

৩০ তারিখ সকাল ১০.০০ ঘটিকার দিকে তারা আটিলারি গোলাবারুদ দিয়ে আক্রমন চালায় এ আক্রমন সাংঘাতিক হয়। ৩০ শে অক্টোবর সালদা নদীতে যুদ্ধের অবস্থান করছিলাম। তারপর আমরা ১৫ ই নভেম্বর ২ ঘন্টা সম্মূখ যুদ্ধের পর আমাদের ক্যাপ্টন গাফ্ফার সাহেব এর কাছে হানাদার বাহিনী মেজরসহ ২২ জন আত্মসমর্পন করে। সেখানে আমাদের কোন মুক্তিযোদ্ধা আহত বা শহীদ হন নাই। তাদের থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র এবং গোলাবারুদ পেয়ে আমাদের শক্তি বেড়ে যায় এবং ২২ জন হানাদার কোনাবন মুক্তিযোদ্ধা কাম্পে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর কাছে বুঝিয়ে দেই।

২২ শে নভেম্বর-কসবা কুটিবাজার হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে সম্মূখ যুদ্ধে মোকাবেলা করি। ২দিন যুদ্ধ চলার পর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। আমাদের কোন মুক্তিযোদ্ধা এ যুদ্ধে আহত বা মারা যাননি এবং ২৫ জন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ক্যাপ্টেন গাফ্ফার সাহেব এর কাছে আত্ম সমর্পন করে। ভারতের মিত্র বাহিনীর কাছে তাদেরকে বুঝিয়ে দেই। কসবা থানাধীন ৩টি ক্যাম্প আমরা হানাদার বাহিনী মুক্ত করতে সক্ষম হই।

১০ ই ডিসেম্বর-আমাদের নিজ থানা নবীনগর হানাদার বাহিনী মুক্ত করা ১৭ ই ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ চালাই। ৩০ শে অক্টোবর হইতে ১৭ ই ডিসেম্বর পর্যন্ত কসবা এবং নবীনগরে ০৪টি হানাদার ক্যাম্প মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। ১৩ ই ডিসেম্বর শাহ্ জিকরুল আহম্মেদ খোকন সাহেবের গ্রুপ কমান্ডারে নেতৃত্বে ২৭ জন রাজাকার বাহিনীকে নবীনগর হাই স্কুল মাঠের পাশে বাংকার থেকে ধরে নিয়ে আসি।

আমাদের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় ৩দিন অতিবাহিত হলে তারা আমাদের সাথে আত্মসমর্পন করার জন্য আনসার কমান্ডার সাইদুর রহমানকে দিয়ে চিঠি পাঠায় এবং তাদের খাবার ফুরিয়ে গেছে তখন আমরা সবাই একটি গরু জবাই করে দিয়ে কিছু খাবার ও মাংস পাঠাই। খাবার পাঠানোর ৩ ঘন্টা পরই আমাদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৩ ই ডিসেম্বর রাতে মাঝিকাড়া গ্রাম আলবদর বাহিনীর কমান্ডার আব্দুল করীম চেয়ারম্যানের বাড়ীতে আমাদের ১জন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল সালাম সরকার শহীদ হন।

তার গ্রামের বাড়ী-কনিকাড়া, তারপর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাই, ১৭ ই ডিসেম্বর বেলা ২ টার দিকে ব্রাহ্মবাড়িয়া থেকে ভারতের মিত্র বাহিনী আটিলারি গোলা নিক্ষেপ করে নবীনগরে। বেলা ৩টায় দিকে সাদা পতাকা উরিয়ে তারা আত্ম সমর্পন করার জন্য বলে প্রতিশ্রুতি দেয় ভারতের মেজর লোহা সিংহের কাছে তারা ১৪ জন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্ম সমর্পন করেন।

তাদেরকে আমরা কসবা রেলষ্টেশন পর্যন্ত পৌছে দিলে তাদেরকে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ভারতে নিয়ে যায় ২০ শে ডিসেম্বর রাজাকার আমীর হোসেন বাড়ীতে চল্লাপাং গ্রামে ৩জন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আশ্রয় নিয়েছে বলে জানতে পারি। তাদেরকে সেখানে থেকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাম্পে পৌছে দেই।

১১) মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন স্মরণীয় ঘটনা যদি থাকে তার বিবরণ:

১৩ ই ডিসেম্বর ২৭ জন রাজাকার বাহিনী ধরে আলমনগর গ্রামে নিয়ে যাই অস্ত্রসহ ঐ দিন রাতে আলমনগর বাটা নদীর পারে কবর খনন করে ২৬ জনকে জীবিত কবর দেয়া হয় এবং একজনকে ডাক্তার আমজাদ হোসেনের মায়ের অনুরোধে ছেড়ে দেয়া হয়। ঐ রাজাকারে নাম খলিলুর রহমান তার বাড়ী আলমনগর গ্রামে ১৪ই ডিসেম্বর আরো ৩ জন রাজাকারকে ধরে রসূলাবাদ গ্রাম নিয়ে যাই, একজনের নাম দানা মিয়া, তার গ্রামের বাড়ী আলিয়াবাদ, গইন্না মিয়া ইব্রাহীমপুর গ্রাম। ফটিক মিয়া নারায়ণপুর গ্রাম।

সেখান থেকে দানা মিয়া রাজাকারকে শ^শুর বাড়ীর গ্রামের পরিচিত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়ী লহরী গ্রামে মুসলিম মিয়ার সুপারিশে তিনি বেঁচে যান। বাকি দুইজনকে সাধারণ জনগণ বিভিন্নভাবে আঘাত করলে তারা মারা যায়। উল্লেখিত যে, নবীনগর থানাধীন বগডহর গ্রামে জল্লা এবং রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ফুলমিয়া আরো ৪ জন আলবাদর বাহিনী ও শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যান, ভাইসচেয়ারম্যান ও সদস্য।

আব্দুল করিম, আব্দুল আজিজ কাঞ্চন, পেরা মিয়া ও সেকেন্দর মৌলভী  (সেকেন্দর মিয়া) (ইউপি চেয়ারম্যান) ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভারতের মিত্র বাহিনীর ক্যাম্পে বোরকা পরে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করে। বর্তমানে আমি এখনো ১৯৭১ সালের মত ২০১০ সাল হতে রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ করিতেছি। মানবতা অপরাধীর মামলার বাদী হিসাবে এখনো যুদ্ধ চলমান আছে।  ১৯৭১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা ও নবীনগরের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাবলী প্রকাশ।

বিনীত নিবেদক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আওয়াল মিয়া, পিতা: মৃত ওমর আলী, মাতা: মৃত নূর চান্দে নেছা, গ্রাম+ডাকঘর: শ্রীরামপুর, উপজেলা ও থানা: নবীনগর, জেলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া।, ভারতে তালিকা নং- ৩৩০৩৩, গেজেট নং- ৩৩৮৩, সাময়িক সনদ নং- ৪৩৭৬৪, মোবাইল: ০১৭৯৭-৭৩৯০৬৮।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

four × five =