কোরবানির চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

0
251

মো.আব্দুল লতিফ বকসী: জাতীয় সম্পদ চামড়া, রক্ষা করবো আমরা’এ শ্লোগানকে সামনে রেখে আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-আযহায় কোরবানির প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং ক্রয়-বিক্রয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চামড়া আমাদের অন্যতম জাতীয় সম্পদ। একসময় চামড়া ছিল আমাদের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। সেই হারানো গৌরভ ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

চামড়া শিল্পকে একটি টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার, প্লাস্টিক সামগ্রী এবং লাইটই ঞ্জিনিয়ারিং খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ‘এক্সপোর্ট কমপেটেটিবনেস ফর জবস (ইসিফোরজে)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৭ সালে। ছয় বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৯৪১ কোটি টাকা। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালকে “প্রডাক্ট অফ দ্রা ইয়ার” ঘোষণা করেছেন।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের চামড়া শিল্পকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নেয়ার জন্য কাজ চলছে। চামড়া শিল্পের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং পণ্যের অত্যাধুনিক ডিজাইন তৈরী করতে প্রশিক্ষণ প্রদান এসব কাজে সফল ভাবেই কাজ করে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ইসিফোরজে প্রকল্প। কোরবানির প্রাণির চামড়া আহরণ, সংরক্ষণ পরিবহন এবং ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত সাপ্লাই চেইনে যাতে কোন ধরনের সমস্যা না হয়, সেজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সারা দেশের প্রশাসন কাজ করেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ মনিটরিং সেল। লবনযুক্ত চামড়া সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ক্রয়-বিক্রয় ক্ষেত্রে সকল বিষয় তদারকির জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করবে। সেলের প্রধান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মালেকা খায়রুন্নেছা (অতিরিক্ত সচিব, প্রশাসন মোবাইল- ০১৭১১০০৫৬৪৬) সদস্যরা হলেন- মো. আমিনুল ইসলাম (উপসচিব, রপ্তানি-৭ মোবাইল-০১৭১৬৪৬২৪৮৪,), মো. সেলিম (উপসচিব, এফটিএ মোবাইল ০১৭১৩৪২৫৫৯৩), মো. জিয়াউর রহমান (বাণিজ্য পরামর্শক মোবাইল ০১৭১২১৬৮৯১৭) যে কোন সদস্যায় ফোন করলেই সহযোগিতা পাওয়া যাবে।

চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, এমপি সংশ্লিষ্টজনদের নিয়ে ভার্চুয়াল মিটিং করে নির্ধারণ করে দেন কোরবানির চামড়ার মূল্য। চামড়ার স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার দর, চাহিদা, সরবরাহ, রপ্তানির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে লবনযুক্ত গরুর চামড়ার মূল্য ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪০-৪৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৩-৩৭ টাকা, সারাদেশে খাসীর চামড়া ১৫-১৭ টাকা এবং বকরির চামড়া ১২-১৪ টাকা ক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীগণকে নির্ধারিত মূল্যে চামড়া ক্রয় নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের প্রতি নির্ধারিত মূল্যে কোরবানির চামড়া ক্রয় করার আহবান জানিয়ে বলেন, এ চামড়ার মূল্য গরীবের হক। এতিম খানা, মাদ্রাসা, আনজুমান মফিদুল ইসলামের মতো সংস্থাগুলোই এ চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। গরীবদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। চামড়া ক্রয় নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করেছে এবং খেলাপী ঋণের ৩% পরিশোধ করে তিন বছরের জন্য ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ প্রদান করেছে। দেশে লবনের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সবধরনের সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

আশা করা হচ্ছে, এবার কোরবানির চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত মুল্যে ক্রয়-বিক্রয়ে কোন ধরনের সমস্যা হবে না।বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে, আগামীতে আরও বাড়বে। সাভারে স্থাপিত নতুন চামড়া শিল্প নগরীতে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। চামড়ার গুণগত মান নিশ্চিত করতে যথাযথ ভাবে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে কোন চামড়া নষ্ট না হয়। সরকার এ বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য দেশের প্রচার মাধ্যমে টিভিসি প্রচার, শ্লোগান, লিফলেট বিতরনসহ পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় প্রচার অভিযান চালাচ্ছে।

বিশেষ উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রানি জবাই’র সময় ও পূর্বে করণীয় ঃ প্রানিকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে। জবাই এর স্থান সমতল ও পরিষ্কার হতে হবে। জবাই এর স্থানে রক্ত জমার জন্য প্রয়োজনীয় সাইজের গর্ত করে নিতে হবে। জবাই এর ছুড়ি বড় এবং যথেষ্ট ধারালো হতে হবে। জবাই এর পর প্রানির রক্ত সম্পূর্ণ ঝরাতে সময় দিতে হবে।

কোরবানির পর প্রানি টানা হেঁচড়া করা যাবে না, এতে ঘর্ষণে চামড়া নষ্ট হতে পারে। কোরবানির পর বর্জ্য দ্রুত ও সঠিকভাবে অপসারণ করে জীবানুনাশক ছিটিয়ে দিতে হবে। মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে।

সঠিক ভাবে চামড়া ছাড়ানোর পদ্ধতি ঃ প্রানি কোরবানির পর সুচালো মাথার ছুরি দিয়ে সঠিক ভাবে লম্বালম্বি ভাবে চামড়া কাটতে হবে। এবার বাঁকানো মাথার ছুড়ি দিয়ে চামড়া ছাড়াতে হবে। রক্তমাখা ছুড়ি কোনভাবেই চামড়ায় মোছা যাবে না। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ পদ্ধতিঃ লবন দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের পূর্বে চামড়ায় লেগে থাকা মাংস, চর্বি, রক্ত, পানি, মাটি ও গোবর ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

চামড়া ছাড়ানোর ৪-৫ ঘন্টার মধ্যে গরুর চামড়ায় ৭-৮ কেজি, ছাগলের চামড়ায় ৩-৪ কেজি লবন ভালোভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে কোন স্থান ফাকা না থাকে। চামড়া সংরক্ষণের স্থান একটু উচু হতে হবে, যাতে চামড়া থেকে পানি ও রক্ত সহজেই গড়িয়ে যেতে পারে। এমন ভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি বা রোদ না লাগে এবং স্বাভাবিক বাতাস চলাচল করতে পারে।

দেশে উৎপাদিত চামড়ার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শুরু করেছে। দেশে চামড়াজাত শিল্পের ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। দেশের অভ্যন্তরিন বিশাল চাহিদা মিটিয়ে অনেক চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। সরকার এ চামড়া খাতকে রপ্তানি মুখি করতে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের মানোন্ননের লক্ষ্যে ঢাকার হাজারিবাগে ইতালি সরকারের আর্তিক সহায়তায় বাংলাদেশ লেদার সার্ভিস সেন্টার স্তাপন করা হয়েছে। সেন্টারটি চামড়া শিল্পের মানোন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে।

প্রথমবারের মতো ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়ে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অতি সম্প্রতি ওয়েট ব্লু চামড়া চাহিদা মোতাবেক বিভিন্ন দেশে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। এক কোটি বর্গফুটের বেশি ওয়েট ব্লু চামড়া ইতোমধ্যে রপ্তানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ রপ্তানির পরিমান দুই কোটি বর্গফুট হতে পারে। এতে করে দেশের চামড়ার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের চামড়াজাত পণ্য তৈরী হচ্ছে। এসব পণ্য রপ্তানিতে সরকার ১৫% হারে নগদ আর্থিক সহায়তা (ক্যাশ ইনসেনটিভ) প্রদান করছে। এ সেক্টরে বিনিয়োগ করতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বেশ উৎসাহী। কারন এ শিল্পের কাঁচামাল স্থানীয় এবং তুলনামূলক কম মূল্যের দক্ষ কর্মী পাওয়া যায়। এখন আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা নেই। সরকারের বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্ট বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিতা সম্পন্ন করতে ওয়ান স্টফ সার্ভিস চালু করেছে।

বিনিয়োগকারীদের সকল আনুষ্ঠানিকতা সহজ ও দ্রুত করা হয়েছে এবং বিশেষ প্যাকেজে সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গড়ে তোলা হচ্ছে ৩০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন। এগুলোতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের চামড়ার তৈরী স্যু, বেল্ট, ব্যাগ, মানিব্যাগ, জ্যাকেট, ট্রাভেলের জন্য সুটকেস ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় বেশি রপ্তানি হচ্ছে।

পাট, চা, চামড়া রপ্তানি করে বাংলাদেশ রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করেছিল। চামড়া বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। এ খাতকে রপ্তানি মুখি করতে সরকারের প্রচেষ্টার শেষ নেই। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাজারে এসেছে প্রাকৃতিক চামড়া। ইংরেজিতে বলা হয় আর্টিফিসিয়াল লেদার। পণ্য প্রস্তুত করা হয় মনের মাধুরি মিসিয়ে নানা রং ও ডিজাইনের। দৃষ্টিনন্দন পণ্য তৈরী করে বাজার দখলের চেষ্টা হয়েছে বিভিন্ন ভাবে।

একসময় পণ্য ব্যবহারকারীরা আবার ফিরে গেছেন অরিজিনাল চামড়ার তৈরী পণ্যের দিকে। তাই বিশ্ববাজারে চামড়ার চাহিদা কমেনি। উন্নত দেশে খামার পদ্ধতিতে পশু উৎপাদনের কারনে প্রাকৃতিক ভাবে পশু উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় কুলাতে পারেনি। তবে সেক্ষেত্রেও চামড়ার মান নিয়ে প্রতিযোগিতা আছে। দেখা গেছে বাংলাদেশের চামড়ার মান বেশ উন্নত প্রাকৃতিক ভাবেই।

সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেশে এখন মানুষ প্রায় সতের কোটি। সংগত কারনেই চামড়াজাত পণ্যের একটি বড় বাজার বাংলাদেশ। ফলে দেশে উৎপাদিত চামড়া দিয়ে অভ্যন্তরিন চাহিদা মিটাতেই হিমসিম খেতে হয়। একসময় ভারত, মিয়ানমারের গরু ছাড়া দেশের মানুষ কোরবানি দিতে পারতেন না। বর্তমান সরকারের বিশেষ উদ্যোগের ফলে কয়েক বছর ধরে কোরবানির জন্য বিদেশ থেকে আর প্রানি আমদানি করতে হয় না। সরকারের পরিকল্পিত সহায়তায় মানুষ এখন ঘরে ঘরে প্রানির খামার গড়ে তুলেছে। বছরের চাহিদা মিটিয়ে আমাদের প্রাণি উদ্বৃত্ত থাকে। ফলে চামড়ার উৎপাদন বেড়েছে যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি।

সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বরাবরই দেশের চামড়া শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে বিশ্বের অনেক দেশে। বাংলাদেশের রপ্তানিতে তৈরী পোশাক শিল্পের অবদান প্রায় ৮৪ ভাগ।যে কোন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন প্রয়োজন। পরিবেশ বান্ধব এবং আধুনিক পদ্ধতিতে চামড়া শিল্পের বিকাশের জন্য সরকার সাভাবে বড় পরিসরে দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে।

হাজারি বাগের চামড়া ব্যবসায়ীগণ সেখানে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সরিয়ে নিয়েছেন। এখান সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে, কর্মবান্ধব পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছে। দেশে উৎপাদিত চামড়া এখন আর নষ্ট হবার কারন নেই। পরিবেশ সুরক্ষায় পর্যাপ্ত শোধনাগারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine + 20 =