হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ

0
350

হাইকোর্টের মামলার শুনানি বছরের পর বছর, এমনকি এক যুগেরও অধিক সময় শুনানি হয় না, শুধুমাত্র নোটিশ ও রুল জারি না হওয়ার কারণে। অনেকের কাছেই বিষয়টি অবিশ্বাস্য ও অবাক হওয়ার মতো হলেও এটাই কিন্তু চরম সত্য ও বাস্তব। কোনো বিচারপ্রার্থী হাইকোর্টে বিচারের প্রত্যাশায় এসে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়ের করেন। হাইকোর্টের বিচারপতি মামলাটি প্রাথমিক শুনানি অন্তে প্রতিপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও রুল জারি করেন চার সপ্তাহ থেকে ছয় মাসের মধ্যে উত্তর প্রদানের জন্য। এই নোটিশটি ঢাকা থেকে বাংলাদেশের যেকোন জেলায় ২৪ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ডাক বিভাগের গ্রান্টেড এক্সপ্রেস পোস্ট (জি.ই.পি) সহ অনেকগুলো কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। হাইকোর্টের সকল চিঠি সরাসরি প্রতিপক্ষের কাছে প্রেরণ করাসহ একই চিঠি সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা জজের মাধ্যমে জারির জন্য প্রেরণ করে। নোটিশটি জারিকারক ২/৩ দিনের মধ্যেই জারি করে সেটি ফেরৎ পাঠাতে পারেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ জারিকারকের সাথে আতাত করে “প্রাপককে পাওয়া যাচ্ছে না” মর্মে মাসের পর মাস বিলম্ব করতে থাকেন। আদালতের প্রেরিত চিঠি প্রাপক গ্রহন না করলে প্রাপকের বাসার সামনে সেটি লটকিয়ে চিঠি জারি করা হয়েছে মর্মে রিপোর্ট দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের সাথে আতাত করে বেশিরভাগ জারিকারকরাই সেটি করেন না। এটিই বিচার বিলম্বের অন্যতম কারণ।

হাইকোর্টের বিচারপতিগণ যে আদেশ প্রদান করেন সেটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সেকসনের বেশিরভাগ দায়িত্বশীলরাই কোনো কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণ করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তদবিরকারী বা তার প্রতিনিধি স্বশরীরে এসে তাদেরকে সন্তুষ্ট না করেন। বিনা কারণে বছরের পর বছর ফাইলটি পড়ে থাকার জন্য দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি সচারাচর চোখে পড়ে না।

আদালত প্রাপকের বরাবরে সাধারণ ডাকযোগে এবং রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ প্রেরণ করার ৩০ দিন অতিবাহিত হলেই নোটিশটি জারি হয়েছে এবং “মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত” মর্মে গণ্য করার বিধান রয়েছে ১৯৮৩ সালের সংশোধিত দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের আদেশ ৫, রুল ১৯(বি)২ এর বিধানে। কিন্তু দূঃখজনক হলেও সত্য যে, ক্ষেত্রবিশেষ এক যুগেরও অধিক সময় ধরে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত না হওয়াতে কোনো রেজিস্ট্রার বা সুপারিন্টেন্ডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট কাউকে শোকজ বা শাস্তি পেতে দেখা যায় না। এটাও সত্য যে, হাইকোর্টের আদেশে ঢাকার জজকোর্টের বিচারাধীন কোনো নথি তলব করা হলে সেটিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এক যুগ অতিক্রান্ত হওয়া সত্বেও ঢাকা জজকোর্ট থেকে নথি হাইকোর্টে এসে পৌঁছায় না, এমনকি হাইকোর্ট থেকে রিমাইন্ডার দেওয়া সত্বেও কোনো কাজ হয় না।

জেলাজজ কর্তৃক হাইকোর্টের এধরনের আদেশ অমান্যের অভিযোগে কাউকে কৈফিয়ত তলব বা সতর্ক করা হয়েছে – এমনটিও চেখে পড়ে না। আবার ঘাটে ঘাটে তদবির করলে সেটি এক সপ্তাহের মধ্যেই হাইকোর্টে পৌঁছে যায়। ফলে বিচারপ্রার্থীরা শুধু বছরের পর বছরই নয়, যুগের পর যুগও হাইকোর্টে ধর্ণা ও দৌড়াদৌড়ি করতে করতে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত ও বিতশ্রাদ্ধ হয়ে পড়ে। এদিকে মামলা চালাতে টাকার যোগান দিতে গিয়ে ধারকর্জ, এমনকি ভিটামাটি বিক্রি করেও মামলা নিষ্পত্তি হয় না যুগের পর যুগ ধরে। এই বিলম্বের কারণে বিচারপ্রার্থীরা আদালতের উপর বিশ্বাস ও আস্হা হারিয়ে গুন্ডা ও মাস্তানদের স্মরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন। এটা কিন্তু মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

এ ধরণের বিলম্বিত বিচার কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকদের কাম্য হতে পারে না। এভাবে আর কতকাল বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদবে? আর এজন্যই কি ৩০ লক্ষ স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্ত, ৩ লক্ষের বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমহানী, এক কোটির বেশি মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশি রাষ্ট্রে গিয়ে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলেন?

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন এই দেশটিকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে। আমরা কি পেরেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে?

কয়েক বছর পূর্বে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টি.আই.বি) তাদের জরিপে বলেছিল যে, বাংলাদেশে এখন সর্বোচ্চ দুর্নীতি উচ্চ আদালতে। রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর সেসময়ের প্রধান বিচারপতি টি.আই.বি’র শীর্ষ কর্মকর্তাদেরকে সকল তথ্য-উপাত্ত ও প্রমানাদিসহ চা পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। টি.আই.বি এর তিন কর্মকর্তা তাদের সমীক্ষার সকল তথ্য-উপাত্ত ও প্রমানাদি উপাস্হাপন করার পর টি.আই.বি-কে ক্ষমা চাইতে হয়নি। অর্থাৎ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যাদি সঠিক ছিল। এখন যদি টি.আই.বি আবার নতুন করে এই চলমান দুর্নীতির গবেষণা করে তাহলে ফলাফল কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

সাধারণ মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়, ভরসা ও আস্হার শেষ স্হান হচ্ছে আদালত। এই পবিত্র আদালতের সুনাম, মর্যাদা ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রক্ষার্থে বিচারপতি এবং আইনজীবীগণ সদা সচেষ্ট থাকবেন – এটাই বিচারপ্রার্থী তথা দেশের আপামর জনগণের একান্ত দাবী ও প্রত্যাশা।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × 4 =