বছর ঘুরে আবারও এলো পহেলা বৈশাখ ১৪২৯

0
131

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।

তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষূরে দাও উড়ায়ে

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক

যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,

অশ্রুবাষ্পে সুদূরে মিলাক

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”

                                   -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এই দিনটি সকল বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। বাঙালি জাতির হাজার বছরের প্রাণের উৎসব। দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ দিবস হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়ে আসছে। এটি বাঙালি জাতির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এ দিনটি সাধারণত ইংরেজি তারিখ ১৪ই এপ্রিলের আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। বছর ঘুরে এবার পর্দাপণ করতে যাচ্ছে নতুন বছর ১৪২৯। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। এদিন সরকারী ও বেসরকারী সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং এভাবেই বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিলো হালখাতা। গ্রামে-গঞ্জে -নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষ্যে তারা তাদের পুরাতন ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুন ভাবে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়ে আসছে।

নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে। যার জন্য গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যাবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং নতুন পোশাক পরিধান করে। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্নীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশির আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলে এখনও বহুল প্রচলিত আছে।

নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে প্রত্যেক বাঙালির কাছে। স্থানীয় কৃষিযাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য,কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎ শিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু- কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ- সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্যের বৈচিত্রময় সমারোহ থাকে মেলায়। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি দেখা যায়। তারা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান,গাজীর গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরণের লোকসঙ্গীত, বাউল- মারফতি- মুর্শিদি- ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়াও শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা উদযাপন করা হয়। এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিনত হয়। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।

নববর্ষে বর্ষবরণের চমকপ্রদ ও জমজমাট অন্যতম আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলন মেলার সৃষ্টি করে। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকায় উচ্ছল জনস্রাতের সৃষ্টি হয় এক জাতীয় বন্ধন। ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণরমনার রমনা বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো হে’- এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে ( ১৯৬৫) ছায়নট প্রথম এই উৎসব শুরু করেছিলেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিট্উিটের বকুলতলায় প্রভাতী অনুষ্ঠানেও বর্ষবরণকে সম্ভাষন জানানো হয়। সেখানে চারুশিল্পীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নববর্ষে আহবান করে তোলে নয়নমনোহর এবং গভীর আবেদনময়। এই শোভাযাত্রা উপভোগ করতে সকল শ্রেণীর মানুষ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, টি.এস.সি. এবং চারুকলাসহ সমগ্র বিশ^বিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। এছাড়াও নববর্ষ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন রেস্তোরায় পাওয়া যায় বৈশাখীর বিশেষ খাবার পান্তাভাত ও ইলিশ মাছ ও রসগোল্লা সহ বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্ন ইত্যাদি।

এছাড়াও নববর্ষ মানেই বাঙালি মেয়েদের সাজগোজের দিন। তারা লাল পাড় সাদা শাড়ী, লাল চুড়ি ও হাতে ফুল নিয়ে বিভিন্ন সাজে নববর্ষকে বরণ করে নেয়। ছেলেরাও সাদা পাঞ্জাবী,পায়জামা ও ধুতি পরিধান করে থাকেন। বৈশাখ মানেই অন্যরমক এক আমেজের মধ্য দিয়ে সকল বাঙালি দিনটি অতিবাহিত করে থাকেন। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আবার এলো নববর্ষ। নতুন বছরটি আমাদের জীবনে বয়ে আনুক সুখ- শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি।

“বছর ঘুরে আবারও এলো

পহেলা বৈশাখ

বাঙালি তাই সেজেছে আজ

নববর্ষের সাজ!

জাতিভেদ ভুলে গিয়ে

এক কাতারে তারা

বর্ষবরণের আনন্দে হয়েছে

দিশেহারা।”

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

16 − 3 =