রাজধানীতে ঈদকে ঘিরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অপরাধী চক্রের সদস্যরা

0
372

স্টাফ রিপোর্টার : কোরবানি ঈদকে ঘিরে সক্রিয় বিভিন্ন ধরনের অপরাধী চক্র। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে পশুর হাট, শপিংমল, ব্যাংকপাড়া, বাসটার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন ও লঞ্চঘাটে। অনলাইনভিত্তিক প্রতারণায় সক্রিয় আরও কিছু প্রতারক। এ ছাড়া ঈদকে ঘিরে পশুর হাট, ফুটপাথ, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার জন্য দেশের বাইরে থাকা পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও তৎপর। পাশাপাশি অজ্ঞান ও মলমপার্টি চক্র, জালনোট চক্রের সদস্যরাও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এসব অপরাধী ও প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেকেই টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান সবকিছু হারাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, দুই ঈদকে ঘিরেই অপরাধীরা তৎপর হয়ে ওঠে। কারণ এ সময় মানুষের কাছে টাকা-পয়সা বেশি থাকে। ক্রেতাদের মধ্যে যেমন টাকা থাকে ঠিক তেমনি ব্যবসায়ীদের বিক্রিবাট্টা ভালো হয়। তাই এই সুযোগটাকে তারা বিভিন্নভাবে কাজে লাগায়।কিন্তু অপরাধীরা যতটা তৎপর তার চেয়ে বেশি তৎপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ইতিমধ্যে অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের আগে পরে ঢাকাবাসীর নিরাপত্তার জন্য আলাদা পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি, সাইবার পেট্রোলিং, টহল টিম বাড়ানো, চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। শপিংমল থেকে শুরু করে বাস, লঞ্চ, রেলওয়ে স্টেশনসহ আরও কিছু এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ বক্স তৈরি করা হয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঈদকে ঘিরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অজ্ঞানপার্টি চক্রের সদস্যরা। বিশেষ করে কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে তারা তাদের তৎপরতা শুরু করেছে ব্যাপকভাবে। কারণ এ সময় কাপড়ের ব্যবসা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে চাঙ্গা ব্যবসা বাণিজ্য হয়। ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানে পণ্য মজুত করার জন্য অনেক সময় নগদ টাকা বহন করেন। বাজারে ক্রেতাদেরও ভিড় বাড়ে। ঢাকার বাইরে থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা পণ্য কেনার জন্য মার্কেটে ভিড় করেন। এ ছাড়া গরু-ছাগল বিক্রির লাখ লাখ টাকা নিয়ে পশু ব্যবসায়ীরাও এক শহর থেকে আরেক শহরে যান। ক্রেতারাও বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে হাটে যান। বিভিন্ন ব্যাংকের শাখাগুলোতে আর্থিক লেনদেন বাড়ে। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগায় অজ্ঞানপার্টি চক্রের সদস্যরা। তারা ব্যাংকের গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের টার্গেট করে মিশন বাস্তবায়ন করে। শহরের বাসটার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন ও লঞ্চঘাটেও চক্রের সদস্যরা সক্রিয় থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ঢাকামুখী যাত্রীদের কখনো পাশের সিটে যাত্রীবেশে অথবা যানবাহনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কিছু খাইয়ে অথবা কিছু শুকিয়ে অজ্ঞান করে মূল্যবান সবকিছু নিয়ে যায়। বছরের অন্যান্য সময় চক্রের আনাগোনা কম থাকলেও ঈদকে সামনে রেখে তৎপরতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রগুলো বলছে, প্রায় প্রতিদিনই অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে ৪/৫ জন রোগী এসে ভর্তি হচ্ছেন।সূত্র বলছে, ঈদের বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দিচ্ছে কিছু চক্র। ঈদ বাজারের হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য কৌশলে তারা বিভিন্ন কেনাকাটার সময় জালনোট ঢুকাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ব্যস্ততার জন্য সময় নিয়ে এসব নোট যাচাই করতে পারেন না। কিন্তু পরবর্তীতে এসব নোট জাল হিসেবেই শনাক্ত হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা প্রতি বছরই ঈদের আগে জালনোট চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেন। কিন্তু এবারের ঈদের আগে এখন পর্যন্ত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের কোনো তথ্য মেলেনি। ঈদকে ঘিরে ঢাকার ফুটপাথ থেকে চাঁদা তোলার মচ্ছব চলছে। মতিঝিল দিলকুশা, আরামবাগ, নয়াপল্টন, দৈনিক বাংলা, মুগদা, মানিকনগর, রামপুরা, জুরাইন, শনিআখরা, লক্ষীবাজার, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, ফার্মগেট, নিউ মার্কেট, হলিডে মার্কেটসহ একাধিক এলাকার ফুটপাথ থেকে নিয়মিত চাঁদার পাশাপাশি ঈদ সেলামিও তোলা হচ্ছে। চাঁদাবাজির কারণে হকাররা বিরক্তি প্রকাশ করছেন। সারাদিন পণ্য বিক্রি করে যা লাভ হয় তার অর্ধেকই নিয়ে যায় চাঁদাবাজরা। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার বড় বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয়। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও বড় অঙ্কের চাঁদাবাজির মিশনে নেমেছে। বিদেশি নম্বর থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের সালাম দিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। উপায়ন্তর না পেয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য অনেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে গোপনে টাকা তুলে দেন সন্ত্রাসীদের দেশীয় প্রতিনিধিদের কাছে। পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তারা ব্যবস্থা নিবেন। এদিকে ঈদের সময় নিজের ও প্রিয়জনের জন্য অনেক কিছু কেনাকাটা করে মানুষ। শপিংমলে গিয়ে কেনাকাটা অনেকের জন্য বিরক্তের। এতে সময়ও নষ্ট হয় যেমন কষ্টও হয়। এজন্য সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের কেনাকাটা অনেকেই অনলাইনে সেরে নেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন পেজের পাশাপাশি অনেকে নামসর্বত্র পেজ থেকে কেনাকাটা করেন। আর এসব অনলাইন কেনাকাটায় অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। কিছু চক্র নামে বেনামে পেজ খুলে বিভিন্ন স্থান থেকে কাপড়সহ অন্যান্য আরও পণ্যের ছবি সংগ্রহ করে তারা ফেসবুকে দিয়ে প্রচার করে। অনেকটা সুন্দরও চকচকা কিসিমের এসব পণ্য দেখলে ক্রেতারা সহজে আকৃষ্ট হয়ে যান।পরে তারা ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য পাঠানোর নাম করে মোবাইল ফোন বন্ধ করে উধাও হয়ে যায়। র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, অপরাধীরা যেমন সক্রিয় হবে আমরাও বসে থাকবো না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিনিয়তই আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। অজ্ঞানপার্টি, জালনোট চক্রের সদস্য, ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছি। যেখানেই আইনবহির্ভূত কাজ হবে এবং যারাই এই কাজ করবে র‌্যাব তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। পশুর হাট, ফুটপাথ, ব্যবসায়ী বা অন্য কোথাও থেকে কেউ চাঁদাবাজি করলে র‌্যাবকে জানাতে হবে। তাহলে র‌্যাব আইনগত ব্যবস্থা নিবে। অজ্ঞানপার্টিকে ঘিরে র‌্যাবের চিরুনি অভিযান চলমান আছে। আমরা প্রতিনিয়ত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করছি। দুই সপ্তাহে অন্তত শতাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের সময় দেশবাসীর সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

15 − three =