খাদ্যে ভেজালকারীর দুনিয়াও ধ্বংস আখেরাতও ধ্বংস

0
607

লেখাঃ- সানজিদ আমিন
খাদ্য আল্লাহতায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। আল্লাহতায়ালা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য, সুস্থ থাকার জন্য এবং যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য পৃথিবীবাসিকে নেয়ামতস্বরূপ বিভিন্ন প্রকার খাদ্য দান করেছেন।

খাদ্যে ভেজাল বলতে বুঝায় – অধিক মুনাফাখোরীর মনোভাব নিয়ে খাদ্যকে আকর্ষণীয় করার জন্য বিভিন্ন ধরনের রঙ মিশানো, খাদ্যকে আরো ঘণ করার জন্য এমাইলাম এর ব্যবহার, মধুতে কেইন সুগারের ব্যবহার, চাল ও মুড়িকে উজ্জ্বল করতে এবং মাছ, মাংস ও সব্জির রক্ষণাবেক্ষণে এবং পশুকে মোটা তাজা করণে ইউরিয়ার ব্যবহার, পচনরোধে বিভিন্ন ফল-মূল ও শাক-সব্জি এবং মাছ-মাংসে ফরমালিনের ব্যবহার, ফল পাকানোর কাজে কেলসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহারকে বুঝায় (কেলসিয়াম কার্বাইডে মারাত্বক বিষ হিসাবে মিশ্রিত থাকে আরসেনিক ও ফসফরাস)। এ সমস্ত কেমিক্যাল অত্যন্ত বিষাক্ত। এগুলো মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। এমনকি এগুলো ধীরে ধীরে ক্যান্সারের ন্যায় মরণব্যাধিকেও ডেকে আনতে পারে। বিধায় খাদ্যে ভেজাল একটি অনৈতিক ও অমানবিক কাজ। এগুলো মুমিনের তো নয় বরং কোনো মানুষেরই কাজ নয়। ইসলামে এ ধরনের কাজ চরমভাবে নিন্দিত। এতে কয়েক ধরনের অপরাধ জড়িয়ে আছে। এক. এটি প্রতারণা ও ধোকাবাজি। দুই. এটি মূলত অবৈধ পন্থায় অপরের অর্থ গ্রহণ যা আত্মসাতের শামিল। তিন. ভেজালমিশ্রিত খাদ্য বিক্রয়ের সময় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কসম করতে হয়। চার. মানুষকে কষ্ট দেওয়া। পাঁচ. মানুষকে শারিরীকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করা।

মানবতাবিরোধী এ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে ইসলামে। সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহপাক বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং তোমরা জেনেশুনে সত্যকে গোপন করো না’ (সূরা বাকারা : ৪২)।

যে কোনো পণ্যে ভেজাল মেশানোর প্রক্রিয়ায় সব কথা ও কর্মকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেমন- অনেক সময় মিথ্যা কথা বলে বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভেজাল পণ্য শতভাগ খাঁটি বলে বিক্রি করা হয়, যা ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। আল্লাহপাক বলেন, ‘মিথ্যার আশ্রয় নেয় তারাই যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করে না।’ (সূরা নাহল : ১০৫)। অনেকে শুধু মিথ্যা বলেই থেমে থাকেন না বরং কসম করে মিথ্যা বলার মাধ্যমে ক্রেতার বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে পণ্য বিক্রি করেন। অথচ নবী করিম (সা.) তা নিষেধ করেছেন। বিশ্বনবী বলেছেন, ‘কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হল- যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।’ (মুসলিম)।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছে। মুশকিল হলো, ভেজাল খাবারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় খুব ধীরে ধীরে। ভেজাল খাবারে নিজের অজান্তেই দেহে বাসা বাঁধছে যেসব মরণব্যাধি, সেগুলোর মধ্য অন্যতম হলো- ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, অরুচি, ক্ষুধামান্দ্য, বদহজম, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, আলসার, লিভার সিরোসিস, অন্ধত্ব, ত্বক-চোখের জ্বালাপোড়া। ভেজাল খাবার খেয়ে মানুষ  বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়, অসুস্থ হয়ে কষ্ট পায়। আর মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম। আল্লাহপাক বলেন, ‘যারা বিনা অপরাধে মোমিন পুরুষ ও মোমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সূরা আহজাব : ৫৮)।

খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারী মানব হত্যা বা গণহত্যাকারী। কারণ এসব খাবার খেয়ে ও পণ্য ভোগ করে অনেকে সরাসরি আবার অনেক মানুষ নীরবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আল্লাহপাক বলেন, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সূরা মায়িদা : ৩২)।

রাসুল (সা.) আল্লাহর ইবাদত তথা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চা এবং দ্বীনি দাওয়াতের জন্য মদিনায় মসজিদ নির্মাণ করেছেন,  তেমনি মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য মদিনায় তিনি ইসলামী বাজার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বনু কায়নুকার বাজারটির পরিচালনার দায়িত্বভার তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। এ বাজারটির বৈশিষ্ট্য ছিল- এখানে কোনো রকম ধোঁকা-প্রতারণা,  ঠকবাজি, মাপে কম-বেশি করার বা পণ্যদ্রব্য মজুদ অথবা আটক করে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণকে কষ্ট দেওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) একদিন এক বিক্রেতার খাদ্য স্তুপের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি খাদ্য স্তুপের ভিতরে হাত প্রবেশ করিয়ে দেখলেন ভিতরেরগুলো ভিজা। তখন রাসুল (সা.) খাদ্য বিক্রেতার নিকট জানতে চাইলেন’ হে খাদ্য বিক্রেতা! এগুলো কী?’ তখন সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! খাদ্যগুলো বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘তুমি এই ভিজা খাদ্যগুলো ওপরে রাখোনি কেন, যাতে সবাই তা দেখে নিতে পারে ।

অতঃপর নবি (স.) বললেন – যে ব্যক্তি প্রতারণা করবে সে আমার উম্মত নয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১০২)।

Content & Editing :- SANJID

খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার ফলে যে অতিরিক্ত অর্থ আসে তা অবৈধ পন্থায় উপার্জিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অবৈধ পন্থায় অপরের সম্পদ ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরাতুল বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে বলেন- “ওয়ালা তাকূলু আমওয়ালাকুম বাইনাকুম বিল বাতিল” অর্থাৎ তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না । সম্পদ ভক্ষণের ক্ষেত্রে মূলত দুটি মূলনীতি আছে। এক. বস্তুটি স্বয়ং হালাল হতে হবে। যেমন মদ হালাল নয়। দুই. বস্তুটি হালাল হলেও তা উপার্জনের পন্থাটি বৈধ হতে হবে। যেমন আম একটি হালাল বস্তু। কিন্তু কেউ যদি তা চুরি করে সংগ্রহ করে তবে তা অবৈধ হবে। কেননা উহার উপার্জনের পন্থাটি বৈধ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হালাল বস্তুকে পবিত্র বলে এবং অবৈধ পন্থায় উপার্জিত বস্তুকে অপবিত্র বলে আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরাতুল আ‘রাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতে বলেন- “ওয়া ইউহিল্লু লাহুমুত তায়্যিবাতি ওয়া ইউহাররিমূ আলায়হিমুল খাবায়িছ” অর্থাৎ তাদের জন্য সকল পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে এবং সকল অপবিত্র বস্তু হারাম করা হয়েছে”। ভেজালযুক্ত খাদ্যের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ অবৈধ এবং হারাম।
যারা খাদ্যে ভেজাল দেয় তাদের উপার্জিত অর্থ অবৈধ হওয়ায় তাদের ইবাদত কবুল হবে না। কারণ মানুষের ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হল হালাল রুজি। হারাম রুজির মাধ্যমে যে রক্ত-মাংস তৈরী হবে সে রক্ত-মাংসের শরীর দ্বারা কোন ইবাদত কবুল হয় না। (মুসনাদু আবি ইয়ালা)। হযরত আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবি (স.) বলেন-“এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে দুহাত তুলে হে প্রভূ! বলে দোয়া করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার মুনাজাত কিভাবে কবুল হতে পারে”! (সাহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১০১৫)। হযরত সাদ (রা.) রাসূল (স.) এর নিকট আরজ করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমার দোয়া কবুল হয়। রাসূল (স.) বললেন- হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দোয়া কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের এক লোকমাও মুখে নেয় তাহলে চল্লিশ দিন যাবত তার দোয়া কবুল হবে না। (আল ইমাম আত তাবারানি, মুজামুল আওসাত।

প্রিয় ব্যবসায়ি ভাইয়েরা

Content & Editing :- SANJID

সানজিদ আমিন

খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে মানুষের শারীরিক সমস্যা তৈরি করা গুরুতর পাপ। প্রয়োজনে ক্রেতার থেকে টাকা বেশি নিন, পচে গেলে ফেলে দিন, তবু খাদ্যসামগ্রীতে কোনো কিছু মেশানো যাবে না। এতে একটু লাভ কম হলেও আল্লাহতায়ালা আপনাদের বরকত দান করবেন। আপনারা প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবেন। দুনিয়াতে শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন।

আপনি যদি কাউকে ধোঁকা দেন, খাবারে কোনো কিছু মেশান, তাহলে দুনিয়ার দায়িত্বশীলদের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও পরকালের বিষয়ে দায়িত্বশীল যারা রয়েছেন, তাদের চোখ ফাঁকি দেওয়া যাবে না। অবশ্যই আপনি ধরা খাবেন। পরকালের কাঠগড়ায় আপনাকে দাঁড়াতে হবে। কঠিন বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।

আল্লাহতায়ালাকে হাজির-নাজির জেনে সবাই অঙ্গীকারাবদ্ধ হই, ‘কোনো খাদ্যে ভেজাল দেব না, মাপে কম দেব না।’ দেশটা অন্তত খাদ্যের ব্যাপারে নির্ভেজাল হোক। মানুষ প্রকৃত খাদ্য খেয়ে সুস্থ থাকুক। বড়ই আশ্চর্য! খাদ্যে মেডিসিনের কারণে একটুও পচে না, নষ্ট হয় না; অথচ তা খেয়ে মানুষের ভেতরটা পচে যাচ্ছে। আখলাক পচে যাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ হয়ে হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে কাতরাচ্ছে।

মানুষের সেবার নিয়তে হালাল ব্যবসা করা এবাদতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্যবসায় ক্রেতাদের প্রতি সহানুভূতি দেখালে বিক্রেতার প্রতি আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জান্নাত দান করবেন।

একজন সৎ ব্যবসায়ী মানুষকে ওজনে কম দিতে পারে না, এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, মেপে দেয়ার সময় পূর্ণভাবে দেবে এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়, এটা উত্তমের পরিণাম উৎকৃষ্ট, (বনি ইসরাইল, আয়াত ৩৫)।

ব্যবসায়ীদের মর্যাদা সম্পর্কে হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণিত হাদিসে বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সত্যবাদী, আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক, শহীদগণের সঙ্গে জান্নাতে থাকবেন, (তিরমিজি)।

একজন সৎ ব্যবসায়ী পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে তা বিক্রি করতে পারে না। ব্যবসার ক্ষেত্রে একজন সৎ ব্যবসায়ী কোনো ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে না।

আল্লাহর ওয়াস্তে এটাকে দ্বীন মনে করুন। এভাবে প্রতারণা করলে আপনি সামাজিকভাবে দোষী, রাষ্ট্রীয়ভাবে দোষী এবং আল্লাহতায়ালার কাছেও দোষী সাব্যস্ত হবেন। আপনি যতই গোপনে করেন, সবকিছু আল্লাহ দেখছেন। গণমাধ্যমের সূত্রে সারা দেশের মানুষের কাছে এ বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই, আপনারা খাদ্যে ভেজাল দেবেন না। কোনো প্রকার মেডিসিন ব্যবহার করবেন না। সরকারের দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে, এ বিষয়ে আরও সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে।

‘‘ভেজাল মুক্ত দেশ আমাদের স্বপ্ন
জাতীয় ভেজাল প্রতিরোধ ফাউন্ডেশন আমাদের গর্ব’’
হাতে হাত রেখে কাধে কাধ মিলিয়ে সবাই মিলে দূর করবো সোনার বাংলাদেশের সব অপকর্ম

প্রচার সম্প্রসারণেঃ- এস এম মোরশেদ , চেয়ারম্যান – জাতীয় ভেজাল প্রতিরোধ ফাউন্ডেশন

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

10 + eighteen =