বরগুনার দুই সাংবাদিক মিলে আত্মসাৎ করেছেন ৭৫ লক্ষ টাকা

0
211

বরগুনা জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে আতংকের নাম এশিয়ান টিভির বরগুনা প্রতিনিধি জহির ও চ্যানেল এস এর প্রতিনিধি সোহরাব হোসেন। এই দুই কথিত সাংবাদিকের খপ্পড়ে পড়ে নি:স্ব হয়েছে অনেক অসহায় পরিবার। হাতেগোনা কয়েকজন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও ক্যামেরার ঝনঝনানির ভয়ে চুপসে যাওয়াদের সংখ্যাই বেশি।
অপরাধ বিচিত্রা এবারের অনুসন্ধানে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বের করে এনেছে যা গা শিউরে ওঠার মতো।
অনুসন্ধানের শুরুতে অনুসন্ধানী টিমের গন্তব্য তালতলীর অঙ্কুজন পাড়া গ্রামে।
ওই গ্রামের মৃত আমজাদ হাওলাদেরর মেয়ে রাহিমা। স্বামী নজরুল ইসলামকে নিয়ে থাকেন রাজধানী শহর ঢাকায়। সেখানে ব্যবসা করেন নজরুল। বছর দুয়েক আগে রাহিমার বোন আকলিমা পরিবারের সবার সাথে যোগাযোগ করে জানায়, তাদের বাবার বেদখলীয় ৫ একর ২১ শতাংশ কার্ডের জমি তিনি উদ্ধার করে দিতে পারবেন। এ কাজে তাকে সহযোগীতা করবে তার মেয়ে রুবি আক্তার ও মেয়ের কথিত স্বামী চ্যানেল এস এর প্রতিনিধি সোহরাব হোসেন। বোন আকলিমার কথায় বিশ্বাস করে ফাঁদে পা দিয়ে দেয় রাহিমাসহ তার আত্মীয় হানিফ,রাজা,সেলিম,নজরুল,ইসহাক মিয়া। এরপর সোহরাব ও এশিয়ান টিভির জাহির মিলেমিশে প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দেয়। সেই জালে আটকা পড়ে ভুক্তভোগীরা খুইয়েছেন প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। থানায় সালিশ বৈঠকের অজুহাতে ও আদালতে মামলা করে পক্ষে রায় এনে দেয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময় টাকা গুলো হাতিয়েছে চক্রটি। সরাসরি টাকা নেয়া ছাড়াও বিভিন্ন সময় বিকাশে লেনদেন করেছে তারা। তবে কখনো থানার ভেতর ঢুকতে পারে নি ভুক্তভোগীরা। তাদেরকে থানার বাহিরে বসিয়ে রেখে টাকা নিয়ে সরাসরি ওসির রুমে চলে যেত চক্রটি।এরপর বের হয়ে দেয়া হত নতুন করে সালিশ-বৈঠকের টোপ। একইভাবে পরের তারিখেও টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। এভাবে অন্তত ১৩ বার বৈঠকের কথা বলে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।
এতগুলো টাকা অসহায় পরিবারগুলো কিভাবে জোগাড় করেছেন সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজেছি আমরা।
বাবার বেদখল জমি উদ্ধারের আশায় ব্যবসায়ী স্বামী নজরুলকে না জানিয়ে মেয়ের নামে ব্যাংকে জমানো অর্থ প্রতারক চক্রের হাতে তুলে দেন রাহিমা। এরপর ফাঁদে আটকে গিয়ে নিজের স্বর্নালঙ্কার বন্ধক দিয়ে এবং বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন থেকে ধার করে ও সমিতি থেকে লোন নিয়ে মোট ২৫ লক্ষ টাকা দেন তিনি। তবে এখন পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করতে করতে নি:স্ব তার স্বামী নজরুল। বন্ধ হয়েছে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া এবং বিক্রি করে দিতে হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবুও সবটাকা পরিশোধ না হওয়ায় আত্মহত্যার পথ ছাড়া কিছুই চোখে দেখছেন না রাহিমা ও তার স্বামী নজরুল।
একই ভাবে নিজের কষ্টের জমানো অর্থ জমি উদ্ধারের আশায় চক্রটির হাতে তুলে দিয়েছিলেন রাহিমার আরেক স্বজন। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
চোখের সামনে ছেলেমেয়েদের এমন দুর্দশা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না রাহিমার মা। তাই প্রতারণার সাথে জড়িত নিজের আরেক মেয়ে আকলিমা ও নাতনি রুবিসহ পুরো চক্রের শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।
অনুসন্ধানী টিম ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলার সময় সেখানে হাজির হোন অভিযুক্ত আকলিমা। এরপর নিজের বাড়ির সামনে নিয়ে যান সাংবাদিকদের।সেখানে বসে তিনি দাবি করেন, ভাইবোনদের কাছ থেকে কোন টাকা নেননি তিনি। কিন্তু বিকাশের লেনদেনের কথা তুলে ধরলে তিনি বলেন, তার বাড়িতেই সমিতি বসে।যেকারণে রাহিমা কিস্তির টাকা পাঠাতো তার নাম্বারে।
অনুসন্ধান বলছে, টাকা হাতিয়ে নিতে চক্রটি বিভিন্ন সমিতি থেকে রাহিমাকে লোন নিয়ে দেয়। এরপর সেই টাকা পরিশোধ করার জন্য সময়মতো কিস্তি দিতে হতো তাকে।
প্রতারক চক্রের অন্যতম মূলহোতা চ্যানেল এস এর কথিত সাংবাদিক সোহরাব সম্পর্কে তার শাশুড়ি আকলিমা কাছে জানতে চাইলে তিনি ওলট পালট বক্তব্য দেয়া শুরু করেন।

গুরুতর এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে সোহরাব ও জহিরের বরগুনা সদরের অফিসে গেলেও তাদের পাওয়া যায় নাই।
বক্তব্য নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় অবৈধভাবে নির্মিত এশিয়ান টিভির কথিত সাংবাদিক জহিরের এই বাড়িতেও গিয়েছে অনুসন্ধানী টিম। সেখানেও পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানী টিম যখন চক্রের মূলহোতাদের খুঁজতে ব্যস্ত ঠিক সেসময় আমাদের কাছে ফোন আসে গাজী মাহমুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষিকা আরজু আক্তার থেকে দেড়হাজার টাকা নিয়ে গেছে কথিত সাংবাদিক জহির ও তার চক্রের সদস্যরা।
এরপর আমাদের অনুসন্ধান মোড় নেয় ভিন্ন দিকে।

পালের বালিয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আবু তালেব খান। তিনিও এই চক্রের খপ্পড়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ একদিন তার প্রতিষ্ঠানে হাজির হয় জহির ও তার চক্রের সদস্যরা।এরপর বিদ্যালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখতে চান তারা।কিন্তু অনুমতি ছাড়া কাগজপত্র দেখাতে অস্বীকৃতি জানালে প্রধান শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিতে থাকে তারা। এক পর্যায়ে জোরপূর্বক বিদ্যালয়ের অফিসের বিভিন্ন কাগজপত্র তল্লাশি শুরু করে তারা। এরপর প্রধান শিক্ষক মো: আবু তালেব খানের একটি চেক বই বের করে সেখানে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেয় তারা। পরে তিনদিনের মধ্যে ১ লাখ টাকা না দিলে মামলা করার হুমকি দেয় চক্রটি। উপায় না পেয়ে শিক্ষক আবু তালেব থানায় অভিযোগ করলে পরদিন চেকটি ফেরত দেয়া হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে আর কোন ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয় তাকে।
এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে জহির ও সোহরাব চক্র।
কয়েকদিন চেষ্টার পর জহিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে ফোন কেটে দেন।
ভুক্তভোগীরা বলছে, সাংবাদিকের মুখোশের আড়ালে চক্রটি চষে বেড়াচ্ছে বরগুনা জেলাজুড়ে। বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে তারা প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দিচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের লাগাম টেনে ধরা না হলে অনেক অসহায় মানুষ নি:স্ব হয়ে যাবে।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

18 − thirteen =