নির্বাচনকে সামনে রেখে নোয়াখালীতে বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ

ইয়াকুব নবী ইমন
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নোয়াখালীতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ করছে সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা। সম্পতি চৌমুহনীতে আগ্নেসাস্ত্র ও গুলিসহ দুই যুবক গ্রেফতার হওয়ার পর নড়ে ছড়ে বসেছে প্রশাসন। নির্বাচন ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, ভয় দেখানো, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় এসব অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাই সুষ্ঠ পরিবেশের নির্বাচনের সার্থে দ্রæত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করার পর সরগরম হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ। জেলার ৬টি নির্বাচনী এলাকায় অনেক প্রার্থীর প্রতিপক্ষরা মহড়া দিচ্ছে। ঘটেছে হামলা, ভাংচুর, গুলি বর্ষনের ঘটনাও। এ সব ঘটনায় প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের মহড়াও দেখা গেছে। এ নিয়ে সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক মহলগুলোতে নানা ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এমন উদ্বেগের মধ্যেই ২ জানুয়ারি দুপুরে চৌমুহনী বাজারের আবাসিক হোটেল রিয়াদ থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃত মো.জাহিদ হাসান রাসেল চৌমুহনী পৌরসভার পৌর হাজীপুর গ্রামের শহীদ হক ওরফে বাবুল মোল্লার ছেলে ও মোহাম্মদ বসু (৪২)। দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বাসুর নতুন বাড়ির নাসির আহাম্মেদের ছেলে। তারা দীর্ঘদিন থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা ও এলাকায় বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ইতিমধ্যে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, বিগত ৫ আগস্টের সময় সোনাইমুড়ী ও চাটখিল থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে কিছু অস্ত্র স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্রের হাতে এখনো রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাসী চক্র নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে অস্ত্রের মহড়া বেড়েছে।
গত বছরের ২১ নভেম্বর হাতিয়া উপজেলার ওছখালী জিরো পয়েন্টে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এবং হাতিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুল আজিমের অনুসারীদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়। ওই সময় প্রকাশ্যে বাজারের উপর আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে বলে প্রত্তক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।
এর আগে গত বছরের ২৫ মার্চ হাতিয়ার জাহাজমারা বাজারে বিএনপি-এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদসহ অর্ধশত আহত হয়। সে সময়ও উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের কথা জানায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তাছাড়াও বিগত দিনে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা কালে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমাতে আওয়ামীলীগের ক্যাডার বাহিনী গঠন করা হয় নোয়াখালীতে। ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রন নিয়ে মামা বাহিনীর প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ভাইরাল হলে তৎকালীন সময়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পাড়ায় পাড়ায় সৃষ্টি হয় কিশোর গ্যাং। তাদের অত্যাচারে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ছিলো অতিষ্ঠ ও জিম্মি। এসব আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে থাকা অস্ত্রের ভান্ডারগুলো এখনো অক্ষত রয়েছে। অস্ত্রাধারীরা অনেক সময় ভাড়ায় খাটে, তারা ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে নির্বাচনের কেন্দ্র দখল ও বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্ঠি করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে বিগত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট জুলাই আন্দোলনের সময় সোনাইমুড়ী ও চাটখিল থানায় হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় হামলাকারীরা চাটখিল থানা থেকে ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪০০টি গোলাবারুদ, চারটি গ্যাসগান, চারটি পিস্তল, ৮টি শটগানসহ লুট করে নিয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন সময় লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালায় আইন শৃংখলা বাহিনী। এসব অভিযানে ৫১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩০০৩টি গোলাবারুদ, দুটি গ্যাসগান উদ্ধার করা হয়। তবে লুণ্ঠিত বাকি অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
একই সময় সোনাইমুড়ি থানা থেকে ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, চার হাজার ৭০৯টি গোলাবারুদ, সাতটি গ্যাসগান লুট হয়। এর মধ্যে ৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, দুই হাজার ৪৬টি গোলাবারুদ ও সাত গ্যাসগান উদ্ধার করা হলেও বাকি অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার করা যায়।
এমতাবস্থায় এলাকাবাসীর আশঙ্কা থানা থেকে খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে রয়েছে। আগামী নির্বাচনে এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার হতে পারে। তাই স্থানীয়দের দাবি দ্রæত সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করা হোক।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনের মাঠ নিরাপদ রাখতে হবে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে। কারণ অবৈধ অস্ত্রধারীরা ভোটের সময় বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে।
নোয়াখালী জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা বোরহান উদ্দিন জানান, নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাসীরা যে সংগঠিত হচ্ছে ও অবৈধ অস্ত্র মজুদ করছে তার প্রমাণ চৌমুহনী থেকে অস্ত্র ও গুলিসহ দুই জন আটক হওয়া। আমরা চাই ভোটের আগেই যেন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হয়।
সুজন’র নোয়াখালী জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু নাছের মঞ্জু জানান, সুষ্ঠ নির্বাচনের পূর্বশর্ত ভয়হীন নির্বাচনী মাঠ তৈরী করা। এক্ষেত্রে সব ছেয়ে বড় বাধা পেশিশক্তি প্রদর্শন ও অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। তাই সুষ্ঠ নির্বাচনের স্বার্থে দ্রæত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। না হয় শান্তিপূর্ন পরিবেশে নির্বাচনের বিষয়টি শঙ্কামুক্ত হবেনা।
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক ও জেলা রির্টানিং অফিসার মো: শফিকুল ইসলাম জানান, নির্বাচনের মাঠ শান্তিপূর্ন রাখতে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপারেশন ডেভিলহ্যান্টের মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক চিহিৃত সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।



