অব্যাবস্থাপনাগাইবান্ধা

ঘাট আছে নৌকা আছে, নদী কই?

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নাব্যতা সংকটের কারণে এক সময়ের প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদ এখন বালুচর। যেখানে এক সময় ঢেউ তুলে ছুটে চলত লঞ্চ-স্টিমার, ফেরি আর নৌকা, সেখানে আজ দিগন্ত বিস্তৃত বালু। মাত্র কয়েকটি সরু খালে ভাগ হয়ে নিঃশব্দে পড়ে আছে হালের ব্রহ্মপুত্র নদ। 

পানিপ্রবাহ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় গাইবান্ধার বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটসহ ব্রহ্মপুত্রের শতাধিক আন্তঃজেলা ও অভ্যন্তরীণ নৌরুট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নৌযান চলাচলের মতো পানি নেই। ফলে চরাঞ্চলের হাজারো বাসিন্দা এখন প্রয়োজনের তাগিদে হেঁটেই পার হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদ।

জানা যায়, গাইবান্ধার অন্তত ৩৫ শতাংশ এলাকা নদী ও চরাঞ্চল। জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বসবাস সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের ১৬৫টি চর ও দ্বীপে। বাসিন্দাদের ৪৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বন্যা, নদীভাঙন, শৈত্যপ্রবাহ আর খরার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই টিকে থাকে চরবাসী। 

একসময় জেলার বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাট ছিল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত নৌ বন্দর। দিনরাত লঞ্চ-স্টিমারের ভেঁপুর শব্দে মুখর থাকত ঘাট এলাকা। শত শত নৌকার আনাগোনায় মুখর ছিল নদীপথের ব্যাবসা-বাণিজ্য। নদীই ছিল মানুষের প্রধান সড়ক। সেখানে এখন ঘাট আছে, নদী নেই। নৌকা বাঁধা পড়ে আছে বালুর স্তরে।

নদীতে জেগে ওঠা চরে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ মাঠ। কিন্তু এই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে মানুষের অন্তহীন দুর্ভোগ। পড়ালেখা ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে যেতে গাইবান্ধার ৫০ লাখের বেশি মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নৌকার বদলে এখন মোটরসাইকেল, ঘোড়ার গাড়ি, এমনকি গরু-মহিষের গাড়িতে করেই চলাচল করতে হচ্ছে তাদের।

নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বদলে যাচ্ছে নদী পাড়ের মানুষদের জীবন ও জীবিকা। মাঝি-মাল্লা, জেলে ও নৌ-শ্রমিকের কাজ বাদ দিয়ে অনেকে দিনমজুরের কাজ করছেন। অনেকেই জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দিয়েছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। 

ফুলছড়ি সদর ইউনিয়নের নৌকার মাঝি জয়নাল বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র নদ এখন প্রায় পানি শূন্য। বালুর স্তরে আটকে আছে আমাদের নৌকা। শুষ্ক মৌসুমের আগেই নদী মরুভূমির মতো হয়ে গেছে। এখন বিশাল বালুচরের ওপর দিয়ে গরু, মহিষ আর ঘোড়ার গাড়ি চলে।’

স্থানীয় একজন স্কুল শিক্ষক স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় ব্রহ্মপুত্র ছিল খরস্রোতা নদ। তিস্তামুখ ঘাটে ভিড়ত বড় বড় লঞ্চ। ফুলছড়িকে না চিনলেও মানুষ তিস্তামুখ ঘাট চিনত। এখন নদীটা দেখতে একটা মরা খালের মতো।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘খণ্ডকালীন ড্রেজিংয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, মাঝে মধ্যে নদীতে ড্রেজিং করে নৌপথ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে এই সংকট নিরসন বেশ চ্যালেঞ্জিং।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button