পুলিশ থেকে ডাকাত ফের ধরা সাবেক এএসআই সুমন উদ্ধার হয়নি অস্ত্র

মুহাম্মদ জুবাইর
পুলিশের পোশাক,পরিচয় আর ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালনা করে আসছিল বরখাস্তকৃত সাবেক এএসআই সুমন চন্দ্র দাস।অতীত অপরাধের একের পর এক নজির থাকার পরও সংশোধনের কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে এবার ৩৫০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে তাকে পাঁচ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ।তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ২৯০ ভরি স্বর্ণ।তবে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, যা তদন্তকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়,সুমন চন্দ্র দাস ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় কর্মরত ছিলেন।সে সময় এক ব্যক্তিকে আটক করে চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত হন তিনি।তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাকে শাস্তিস্বরূপ এএসআই পদ থেকে অবনমিত করে নায়েক করা হয় এবং পুলিশ লাইনে সংযুক্ত রাখা হয়।কিন্তু এটিই ছিল না তার অপরাধ জীবনের শুরু বা শেষ।
এরও আগে,২০১০ সালে পাঁচলাইশ থানার পুলিশের হাতে ছিনতাই করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছিল সুমন। কারাভোগের পর জামিনে বের হলেও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি।বরং পুলিশ বাহিনীতে থেকে অপরাধের কৌশল,তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত এড়ানোর পদ্ধতি আরও নিখুঁতভাবে রপ্ত করে নেয় সে।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ভোরে সংঘটিত হয় আলোচিত এই স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনা।নগরীর হাজারী গলির ‘জয়রাম ট্রেডার্স’এর স্বর্ণের কারিগর বিভাস রায়,সবুজ দেবনাথ ও পিন্টু ধর ৩৫টি স্বর্ণের বার মোট ৩৫০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশাযোগে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন।ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তাদের বহনকারী সিএনজিটি আতুরার ডিপো এলাকায় পৌঁছালে দুটি মোটরসাইকেলে করে আসা চার যুবক পথরোধ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা ধারালো ছুরি ও একটি পিস্তল দেখিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে মুহূর্তের মধ্যেই সিএনজি থেকে স্বর্ণের বারগুলো ছিনিয়ে নেয় এবং দ্রুত পালিয়ে যায়।পুরো ঘটনাটি এতটাই পরিকল্পিত ও নিখুঁত ছিল যে,কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা এলাকা ছাড়তে সক্ষম হয়।
ছিনতাইয়ের ঘটনার পরপরই নগর পুলিশ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে।তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ছিনতাইকারীদের গতিবিধি ও অবস্থান শনাক্ত করা হয়।নগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) হাবিবুর রহমান প্রমাণিক জানান, প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে গাজীপুর জেলার কাশিমপুরের মাধবপুর এলাকা থেকে সুমন চন্দ্র দাস, মাসুদ ও ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি আরও জানান,প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ থানা পুলিশ করলেও পরবর্তীতে পুলিশ কমিশনার মামলাটির তদন্তভার নগর গোয়েন্দা পুলিশকে দেন।নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে মামলাটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী,এই ছিনতাইয়ে সুমনের নেতৃত্বে মোট ৮ থেকে ৯ জন জড়িত ছিল।যদিও মামলার এজাহারে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে,তবে তদন্তে উঠে এসেছে স্বর্ণের বার গোপন রাখা,পরিবহন,তথ্য সরবরাহ এবং পাচারে জড়িত ছিল আরও কয়েকজন।
সুমনের দেওয়া তথ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার রায়েরবাজার এলাকা থেকে রবি নামের এক ব্যক্তিকে এবং চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকা থেকে তার স্ত্রী পান্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়।পান্নার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকার মোহাম্মদপুরে তার বোন প্রতিমা দাশের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ২৯টি সোনার বার।এছাড়া ছিনতাইয়ের স্বর্ণ বহনের তথ্য সরবরাহের অভিযোগে একটি জুয়েলারি দোকানের কর্মচারী বিবেক বণিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিসি হাবিবুর রহমান প্রমাণিক জানান,ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত পিস্তলটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।অস্ত্রটি কোথা থেকে এসেছে,এটি বৈধ নাকি অবৈধ এবং ভবিষ্যতে অপরাধে ব্যবহারের ঝুঁকি সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
সুমন চন্দ্র দাসের অপরাধ ইতিহাসে ২০২১ সালও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।ওই বছরের ডিসেম্বরে সিআইডি পুলিশের হাতে ১২ পিস স্বর্ণবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিল সে।ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২১ সালের ১১ মে।নগরীর হাজারীগলির ‘এন কে জুয়েলারি’র ম্যানেজার শেফাল বণিক ১২টি স্বর্ণের বার নিয়ে ঢাকার তাঁতীবাজারে যাচ্ছিলেন।
সিটি গেট এলাকায় কৌশলে তাকে একটি প্রাইভেটকারে তুলে নেয় ছিনতাইকারীরা।গাড়ির ভেতরেই পুলিশ পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে স্বর্ণের বারগুলো ছিনিয়ে নেয়।পরে চোখে মলম লাগিয়ে ভোরের দিকে জোরারগঞ্জ থানার বারৈয়ার হাট এলাকায় তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়।
এই মামলায় গ্রেপ্তার মোহন পাল আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে।সে জানায়, বরখাস্তকৃত এএসআই সুমন চন্দ্র দাসের সোর্স হিসেবে কাজ করত সে।শেফাল বণিকের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল এবং তারা একসঙ্গে অনলাইনে আইপিএল জুয়া খেলত।
কথায় কথায় সে জানতে পারে,শেফাল নিয়মিত ঢাকায় স্বর্ণের বার নিয়ে যাতায়াত করে।এই তথ্য সে সুমনকে জানায় এবং এমনকি শেফালের ছবিও পাঠায়।ঘটনার আগের দিন তাস খেলার সময় নিশ্চিত হয় যে পরদিন শেফাল ঢাকায় যাবে। এরপরই ছিনতাইয়ের ছক কষা হয়।
এই ঘটনাগুলোতে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়—পুলিশ পরিচয়। সাবেক পুলিশ সদস্য হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম, টহল, চেকপোস্ট এবং মানুষের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সহজেই বিশ্বাস অর্জন করত সুমন।পুলিশ পরিচয় দেখিয়ে সে শুধু স্বর্ণ ছিনতাই করেনি, বরং আইনের প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
একাধিকবার একই ধরনের অপরাধে জড়িত থেকেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোয় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।সচেতন মহল বলছে,এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধ প্রবণতা কমবে না।
পুলিশ জানিয়েছে,সুমন চন্দ্র দাস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।একই সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কি না,তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একজন পুলিশ সদস্য যখন অপরাধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়,তখন তা শুধু একটি অপরাধ নয় তা পুরো ব্যবস্থার ওপর আঘাত।সাবেক এএসআই সুমন চন্দ্র দাসের কাহিনি সেই কঠিন বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ।৩৫০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের এই ঘটনা শুধু একটি মামলার গল্প নয়,বরং এটি আইন,নৈতিকতা ও আস্থার এক ভয়ংকর ভাঙনের দলিল।এখন দেখার বিষয় আইনের কঠোর প্রয়োগে এই চক্রের পরিণতি কী হয়।



