আইন-শৃঙ্খলাপ্রশাসন

রাউজান রাঙ্গুনিয়ায় পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ গ্রেফতার ৭

মুহাম্মদ জুবাইর

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় সংঘটিত একাধিক পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে।পুলিশ জানিয়েছে,দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট,জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে।এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গত ডিসেম্বর ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় গভীর রাতে কয়েকটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।এতে কিছু বসতঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি বসতঘর সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়ে যায়। হঠাৎ সংঘটিত এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি একাধিক ব্যানার উদ্ধার করে। এসব ব্যানারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল।রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টানিয়ে বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ধরন বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে চিহ্নিত করে।

ঘটনার তদন্ত ও জড়িতদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, কল ডিটেইলস যাচাই এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যাপক তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ০২ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি. দুপুর আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কলেজ গেট এলাকা থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার বসতঘর তল্লাশি করে ৩টি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত ব্যানারের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। সে জানায়, রাঙ্গামাটির লোকমান, রাঙ্গামাটি পৌরসভার সাবেক এক কমিশনার এবং রাউজানের একজন ব্যক্তির পরিকল্পনায় ১৫-১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে ওঠে। এই চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং একইসঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি ও ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে উসকানিমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার টানিয়ে রাখা হয়।

তদন্তে আরও জানা যায়, এসব ঘটনার মাধ্যমে একদিকে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং অপরদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেফতারকৃত আসামি মনিরের পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকেও ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর সংযুক্ত করা হয়, যাতে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে ভিন্ন ব্যক্তিদের জড়িয়ে দেওয়া যায়।

আসামি মনির থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ আরও ৬ জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান এবং মো. পারভেজ।
ঘটনাস্থল ও আসামিদের হেফাজত থেকে পুলিশ উসকানিমূলক ব্যানার ৪টি, কেরোসিন তেলের কন্টেইনার ২টি, কেরোসিন তেলের বোতল ১টি, কেরোসিন তেলমাখা লুঙ্গি ১টি, তেলমাখা পুরাতন কালো শার্ট ১টি, খালি প্লাস্টিকের বস্তা ৩টি, ব্যানারে উল্লেখিত মোবাইল নম্বর সংরক্ষিত মোবাইল ফোন ১টি, সিএনজি চালিত অটোরিকশা ১টি এবং মোটরসাইকেল ১টি উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, এসব যানবাহন পাঁচটি ঘটনাস্থলে যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল।

প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, মূল পরিকল্পনাকারী স্থানীয় একজন নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি। তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়কারী হিসেবে রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী একজন ব্যক্তি অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করেন। এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন সমর্থিত এক সাবেক কমিশনারের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

গ্রেফতারকৃত আসামি মনির ইতোমধ্যে ঘটনার দায় স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে,অগ্নিসংযোগ,উসকানি ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। এ ধরনের অপরাধে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ বদ্ধপরিকর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button