চসিক মেয়রের দোহাই দিয়ে ফুটপাত দখল পাহাড়তলীতে প্রকাশ্য দখল বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বিএনপির নাম ভাঙিয়ে রাস্তা দখল শ্রমিক ও পথচারীদের জীবন ঝুঁকিতে
চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানা এলাকার সাগরিকা বিসিক শিল্প নগরীতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চসিকের ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে দিনের পর দিন গড়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ স্থাপনা।প্রকাশ্যেই চলছে দখল বাণিজ্য।এতে সাধারণ পথচারী গার্মেন্ট শ্রমিক এবং বিভিন্ন কারখানার কর্মজীবী মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ফুটপাত দখলের কারণে বাধ্য হয়ে যান চলাচলের মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা।এলাকাজুড়ে এখন ক্ষোভ আর আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের অভিযোগ সাগরিকা বিসিক শিল্প এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতগুলো দীর্ঘদিন ধরে দখল করে দোকান ঘর রাজনৈতিক কার্যালয় ও অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।এসব দখল কার্যক্রমে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনের নাম ব্যবহার করছে আবার কেউ কেউ বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের অপকর্ম বৈধ করার চেষ্টা করছে।কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান না থাকায় দখলদাররা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে সাগরিকা বিসিক শিল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বিসিক শিল্প নগরীর ভেতর ও সংলগ্ন প্রধান সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে অসংখ্য দোকান চা স্টল খাবারের দোকান এবং বিভিন্ন অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে।কোথাও কোথাও ফুটপাত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।ফলে কয়েক হাজার শ্রমিক প্রতিদিন কারখানায় যাতায়াতের সময় মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে হাঁটতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারা।
এলাকাবাসী ও বিভিন্ন গার্মেন্টস শ্রমিকদের অভিযোগ এই দখল কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিসিক শ্রমিক দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট সরোয়ার।অভিযোগ রয়েছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে একাধিক দোকান নির্মাণ করেছেন।শুধু তাই নয় সম্প্রতি শ্রমিক দলের অফিসের নাম ব্যবহার করে নতুন করে আরও একটি স্থাপনা গড়ে তুলছেন।স্থানীয়রা বলছেন এসব স্থাপনা নির্মাণের সময় কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং চসিকের কোনো নোটিশও দৃশ্যমান নয়।
একজন স্থানীয় দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন এখানে যে ফুটপাত ছিল সেটি দিয়ে আগে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারত।এখন দোকান আর অফিস বানিয়ে পুরো রাস্তা দখল করে ফেলেছে।আমরা কিছু বললেই প্রভাবশালীদের ভয় দেখানো হয়।বলা হয় উপর থেকে সব ম্যানেজ করা আছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সরোয়ারের সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার না করে বরং দাবি করেন এসব বিষয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা শাহাদাত হোসেন মহোদয় অবগত আছেন এবং এসব স্থাপনার উদ্বোধনের জন্য তাকেই দাওয়াত দেওয়া হবে।তার এই বক্তব্য ঘিরে এলাকায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।চসিকের জায়গা দখল করে কীভাবে এমন স্থাপনা গড়ে উঠছে এবং মেয়রের নাম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে দখল বাণিজ্য চালানো হচ্ছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
সরোয়ার আরও বলেন এ বিষয়ে ১০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিও অবগত রয়েছেন।তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। স্থানীয়দের মতে রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়েই দিনের পর দিন ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন চসিকের জায়গা দখল করে কীভাবে এভাবে দোকান ও অফিস নির্মাণ করা হয়।কার প্রশ্রয়ে চলছে এই দখল বাণিজ্য।প্রশাসনের নীরবতা কি দখলদারদের আরও উৎসাহিত করছে না।নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও নজরদারি থাকলে কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।
আরও ভয়ংকর অভিযোগ উঠে এসেছে স্থানীয় শ্রমিকদের কাছ থেকে।তারা বলছেন প্রতিনিয়ত ক্ষমতার দোহাই দিয়ে ফুটপাত দখল করে দোকানসহ বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের অফিস ঘর তুলে ফেলেছেন কিছু নেতা।এসব স্থাপনায় সারাদিন আড্ডা চলে।সন্ধ্যার পর সেখানে ভিড় বাড়ে। এতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
একজন পোশাক কারখানার নারী শ্রমিক বলেন আগে আমরা ফুটপাত দিয়ে নিরাপদে হেঁটে বাসায় যেতে পারতাম।এখন দোকান আর অফিসের কারণে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়।বড় গাড়ি বাস ট্রাকের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে বুক ধড়ফড় করে।প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে।
এলাকায় একাধিকবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও পথচারী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।কিন্তু ফুটপাত দখল উচ্ছেদে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন অত্র এলাকার এক শ্রমিকদল নেতা যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।তিনি জানান আমরা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন মিলে মাথাপিছু তিন হাজার টাকা করে দিয়ে এই ফুটপাত দখল করে অফিসটি নির্মাণ করেছি।এখানে বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের সকল নেতাকর্মীরা আসবে এবং আড্ডা দিবে।তার এই বক্তব্য দখল বাণিজ্যের আর্থিক দিকটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন প্রকাশ্যে টাকা তুলে চসিকের ফুটপাত দখল করে রাজনৈতিক অফিস নির্মাণ করা হলে তা শুধু অবৈধই নয় বরং নগর ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতার প্রমাণ।এতে একদিকে সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দখল সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
আইন ও নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আইন অনুযায়ী ফুটপাত ও সড়ক দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি।এমনকি রাজনৈতিক কার্যালয় হলেও অনুমোদন ছাড়া সরকারি জায়গা ব্যবহার করা যায় না।দখলদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নগরজুড়ে এমন দখল আরও ছড়িয়ে পড়বে।
এলাকাবাসী দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা অবিলম্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ফুটপাত ও রাস্তা জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী করার আহ্বান জানান।পাশাপাশি দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় যাই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন।
চট্টগ্রাম নগরীতে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কথা বলা হলেও বাস্তবে ফুটপাত দখল আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে।পাহাড়তলীর সাগরিকা বিসিক শিল্প নগরীর এই চিত্র নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব চেহারা তুলে ধরছে বলে মনে করছেন অনেকেই।এখন দেখার বিষয় প্রশাসন কত দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং সাধারণ মানুষের ফুটপাত ফেরত পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হয় কিনা।



