রাজনীতি

জাতীয়তাবাদের রূপকার শহীদ জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী

মুহাম্মদ জুবাইর

আজ বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী।১৯৩৬ সালের এই দিনে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক।শৈশবকাল থেকেই শৃঙ্খলা দেশপ্রেম এবং আত্মমর্যাদাবোধে বেড়ে ওঠা জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতার নাম।তার জন্মদিন শুধু একটি ব্যক্তির জন্মদিন নয় এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

আজ সারাদেশের মানুষ বিনম্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে এই মহান রাষ্ট্রনায়ককে যার হাত ধরেই বাংলাদেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন না বরং তিনি রাষ্ট্র নির্মাণের দর্শন উপহার দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্ব দর্শন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আজও দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল সংগ্রাম সাহস ও ত্যাগে ভরপুর।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ়।সেই ভয়াল রাতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান যে ঘোষণা দেন তা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।তার বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারিত উই রিভোল্ট ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যেই মুক্তিকামী বাঙালিকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তার এই সাহসী পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য কোটি মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেই ঘোষণার পর থেকেই জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য প্রতীক। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন এবং তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। মুক্তিযুদ্ধে তার সামরিক দক্ষতা কৌশলগত চিন্তা ও নেতৃত্বগুণ আজও সামরিক ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দিশাহীনতার মধ্যে পড়েছিল তখনও জিয়াউর রহমান ছিলেন নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন।সে সময় দেশ ছিল একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল এবং চরম অরাজকতার কবলে।অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর প্রশাসন ছিল স্থবির আর জনগণ ছিল চরম হতাশায় নিমজ্জিত।সেই ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন শহীদ জিয়া।তিনি প্রথমেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।তার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তিনি জনগণকে তাদের ভোটাধিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরিয়ে দেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না বরং এটি ছিল একটি উদার জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্ল্যাটফর্ম।তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি যেখানে ডান বাম মধ্যপন্থী সকল দেশপ্রেমিক শক্তি একত্রিত হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করবে।তার প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বাঙালি জাতিকে একটি স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় দেয় যা কেবল ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ধর্মীয় সহনশীলতা ও জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়ে গঠিত। এই দর্শন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তক দূরদর্শী নেতা এবং বাস্তববাদী প্রশাসক।দেশকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে তিনি প্রবর্তন করেন ১৯ দফা কর্মসূচি যা কৃষি শিল্প শিক্ষা স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সংস্কারে এক সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়।তার উদ্যোগে শুরু হয় খাল কাটা কর্মসূচি যা কৃষি বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামবাংলার জলাবদ্ধতা দূর করে সেচব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে তিনি কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ান। কলকারখানা পুনরায় চালু করে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। তার সময়েই বাংলাদেশ রপ্তানিমুখী অর্থনীতির পথে হাঁটা শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করে তিনি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন যা আজও দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

আজকের বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের যে শক্ত ভিত তার কারিগর ছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তার উদ্যোগেই গঠিত হয় সার্ক যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন দূরদর্শী ও কূটনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত করে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের চাবিকাঠি।

ব্যক্তিগত জীবনে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে সৎ ও বিনয়ী। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি বিলাসিতা থেকে দূরে ছিলেন।তার ভাঙা স্যুটকেস ছেঁড়া গেঞ্জি এবং সাধারণ জীবনযাপনের গল্প আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তিনি বিশ্বাস করতেন ব্যক্তির চেয়ে দল বড় দলের চেয়ে দেশ বড়। তার দেশপ্রেমের মূল ভিত্তি ছিল জনগণের ক্ষমতায়ন। তিনি বলতেন জনগণের নেতৃত্ব দিতে হলে জনগণের মধ্যেই থাকতে হবে। তিনি গ্রামে গ্রামে হেঁটে গিয়েছেন খাল কাটা কর্মসূচি তদারকি করেছেন সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট শুনেছেন। গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের জনগণ কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল বিপদগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদাৎ বরণ করেন এই মহান নেতা। তার শাহাদাতের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া।ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ শোক সমাবেশে পরিণত হয়। কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় প্রমাণ করে জিয়াউর রহমান কোনো একক দলের নেতা ছিলেন না তিনি ছিলেন এ দেশের আপামর মানুষের প্রাণের নেতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শহীদ জিয়ার স্মৃতি মুছে ফেলার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রতি বছর তার জন্মবার্ষিকী ও শাহাদাৎ বার্ষিকীর কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের মাজারে ফুল দিতে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। লুই আই কানের নকশার অজুহাতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে তার মাজার সরিয়ে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বারবার এই মাজারকে অবৈধ ও ভুয়া আখ্যা দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। পাঠ্যপুস্তক থেকে তার অবদানের কথা মুছে ফেলা হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণায় তার ভূমিকা নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন তোলা হয়েছে এমনকি তার বীর উত্তম খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। এসব কর্মকাণ্ড ইতিহাস বিকৃতির এক নগ্ন দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবে আজকের এই ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তার আদর্শ দেশপ্রেম ও নেতৃত্ব আজও বাংলাদেশের পথনির্দেশক হয়ে আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বহুদলীয় গণতন্ত্র বাকস্বাধীনতা জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের প্রতিটি স্পন্দনে শহীদ জিয়ার নাম গভীরভাবে মিশে আছে। বর্তমানের এই সংকটময় সময়ে তার প্রদর্শিত পথেই দেশ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব। তার জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনিঃশেষ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button