গুলিতে ঝরল রাষ্ট্রের সন্তান জঙ্গল সলিমপুরে রক্তাক্ত আতঙ্কের প্রতীক আলিনগর ছিন্নমূল

মুহাম্মদ জুবাইর
সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর,অবশেষে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখেই থেমে গেল
র্যাবে কর্মরত নায়েব সুবেদার মোতালেব জীবন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিজিবি থেকে প্রেষণে র্যাবে কর্মরত নায়েব সুবেদার মোতালেব নিহত হয়েছেন।রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সাহসী সদস্যের এমন নির্মম মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।সোমবার ১৯ জানুয়ারি বিকেলে র্যাব ৭ এর অধীনে পরিচালিত একটি অভিযানে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে।
অভিযানের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস মাদক অস্ত্র ও ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে একটি পুরো জনপদকে জিম্মি করে রাখা ভয়ংকর সন্ত্রাসী চক্রকে আইনের আওতায় আনা।কিন্তু সেই অভিযানে রাষ্ট্রকেই দিতে হলো এক মূল্যবান প্রাণ।নিহত নায়েব সুবেদার মোতালেব ছিলেন বিজিবির একজন প্রশিক্ষিত প্লাটুন কমান্ডার পর্যায়ের কর্মকর্তা যিনি মাঠপর্যায়ের অপারেশনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতায় দক্ষ ছিলেন।ধর্মভীরু শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বনিষ্ঠ এই কর্মকর্তা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বারবার ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
অবশেষে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখেই থেমে গেল তার জীবন। এই হামলায় র্যাবের আরও চারজন সদস্য গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।র্যাব ৭ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও সিনিয়র সহকারী পরিচালক গণমাধ্যম এআরএম মোজাফফর হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা অতর্কিতভাবে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।একপর্যায়ে গোলাগুলির মধ্যে তিনজন সদস্যকে আটকে রাখার খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করে তাদের উদ্ধারে অভিযান জোরদার করা হয়।সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহিনুল ইসলাম জানান হামলার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং পুরো এলাকা অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর আলিনগর ছিন্নমূল এলাকা বহু বছর ধরেই সন্ত্রাসের আরেক নাম।স্থানীয়দের ভাষায় এটি যেন বাংলাদেশের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশ মানেই যুদ্ধ।এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই এলাকায় সংঘটিত হয় না।মাদক কারবার রাহাজানি ছিনতাই ডাকাতি অস্ত্রের ঝনঝনানি জুয়া অপহরণ দখলবাজি পরিকল্পিত খুন ধর্ষণ এমনকি অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানাও রয়েছে এখানে।সাংবাদিক প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ র্যাব কেউই এখানে নিরাপদ নন।
অতীতে একাধিকবার অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে প্রশাসন।এলাকাবাসীর অভিযোগ হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।কেউ মুখ খুললেই নেমে আসে হামলা মিথ্যা মামলা রক্তাক্ত প্রতিশোধ। স্থানীয়দের মতে এই এলাকার অধিকাংশ সন্ত্রাসী নিজেরাই আধুনিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম।দীর্ঘ চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি।দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাহাড়খেকো ভূমিদস্যু ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখানে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায় প্রায় তিন হাজার একশ একর আয়তনের এই জঙ্গল সলিমপুরে লিংক রোড সংলগ্ন প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য নয় থেকে দশ লাখ টাকা।সে হিসেবে সরকারি খাসজমি দখলের বাজারমূল্য প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা।এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থই জঙ্গল সলিমপুরকে পরিণত করেছে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের পাঁচ আগস্ট থেকে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।পাহাড় দখলকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে।
কিছুদিন আগেই দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হন।তার পরদিন সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।২০২৩ সালের চৌদ্দ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত বিশজন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে।
মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার শিরোনামে দেখা যায় কিছু সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হচ্ছে।কিন্তু অভিযোগ রয়েছে কোনো অদৃশ্য শক্তির কারণে তারা অল্পদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আবারও আগের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছেন কবে শেষ হবে এই সন্ত্রাসের রাজত্ব।আলিনগর ছিন্নমূল নামটি এখন আতঙ্কের প্রতীক।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন আমরা মাঝেমধ্যে দেখি কিছু ভুয়া সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করে।এতে প্রকৃত সাংবাদিকরা বিপদের মুখে পড়েন।এসব ভুয়া সাংবাদিকদের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কঠিন সম্পর্ক রয়েছে।তাদেরকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।এলাকাবাসীর অভিযোগ শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন,রোকন মেম্বার , লাল বাদশা ও মনা সহ আরও বেশ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। নায়েব সুবেদার মোতালেবের রক্তে আবারও প্রমাণ হলো জঙ্গল সলিমপুর কেবল একটি এলাকা নয় এটি রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ।রাষ্ট্রের প্রশ্ন এখন একটাই আর কত প্রাণ গেলে এই সন্ত্রাসের জনপদ ধ্বংস হবে।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসের এই রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে ভয়ংকর ভূমিকা পালন করছে একটি ভুয়া সাংবাদিক সিন্ডিকেট।স্থানীয়দের অভিযোগ এইসব কথিত সাংবাদিকরা আদতে সন্ত্রাসীদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছে।সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সুবিধা নিয়ে তারা পরিকল্পিতভাবে প্রশাসন র্যাব পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালায়।
অভিযানের আগে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন পোর্টালে উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রকৃত সাংবাদিক জানান জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সত্য সংবাদ প্রকাশ করলেই হুমকি আসে।কেউ কেউ হামলার শিকার হয়েছেন কেউ মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন।ফলে মূলধারার সাংবাদিকরা বাধ্য হয়ে অনেক সময় এই এলাকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে ভয় পান।এই সুযোগে ভুয়া সাংবাদিকরা সন্ত্রাসীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।স্থানীয়দের ভাষায় এরা কলম দিয়ে সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ বলয় তৈরি করছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন অভিযান শুরুর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।এতে সন্ত্রাসীরা আগেভাগে অবস্থান বদলে নেয় কিংবা সংঘবদ্ধ হামলার প্রস্তুতি নেয়।জঙ্গল সলিমপুরে সাংবাদিক প্রশাসন ও ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর বারবার হামলার পেছনেও এই তথ্য ফাঁসকারী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের উচ্ছেদ অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর যে পরিকল্পিত হামলা হয়েছিল সেটিও ছিল আগাম প্রস্তুতির ফল।সন্ত্রাসীরা তখন প্রশাসনের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইট পাথর ককটেল নিক্ষেপ করে।ওই হামলায় অন্তত বিশজন আহত হন। এর আগেও র্যাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর চালানো হামলার সময় একই কায়দায় প্রশাসনিক তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।স্থানীয়দের দাবি জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি নয় এটি প্রশাসন বিরোধী ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রস্থল। পাহাড় দখল অস্ত্র মাদক আর ভূমিদস্যুতার অর্থেই এখানে গড়ে উঠেছে একটি সমান্তরাল ক্ষমতাকাঠামো।
এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সন্ত্রাসী দালাল ভূমিদস্যু অস্ত্র কারিগর এবং ভুয়া সাংবাদিকদের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক।এলাকাবাসীর অভিযোগ শীর্ষ সন্ত্রাসী লাল বাদশা ও মনার নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি অস্ত্র কারখানা পরিচালনা করছে।এসব অস্ত্র শুধু স্থানীয় অপরাধে নয় আশপাশের থানা ও জেলার অপরাধেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বারবার অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর স্থায়ী ব্যবস্থা না হওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম হতাশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন আমরা দোকান খুলে বসতে পারি না চাঁদা না দিলে হামলা হয়। কেউ মুখ খুললে তাকে ভুয়া মামলায় ফাঁসানো হয়।
প্রশাসনের অভিযান এলেই ভুয়া সাংবাদিকরা সন্ত্রাসীদের পক্ষে লেখা দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে।তিনি বলেন এসব ভুয়া সাংবাদিকদের আইনের আওতায় না আনলে জঙ্গল সলিমপুর কখনোই নিয়ন্ত্রণে আসবে না।সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন নায়েব সুবেদার মোতালেবের হত্যাকাণ্ড শুধু একজন কর্মকর্তার মৃত্যু নয় এটি রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আঘাত। এই ঘটনার পরও যদি জঙ্গল সলিমপুরকে পূর্ণাঙ্গভাবে সন্ত্রাসমুক্ত করা না হয় তবে ভবিষ্যতে আরও প্রাণ ঝরবে।তারা অবিলম্বে পাহাড় দখল উচ্ছেদ অস্ত্র কারখানা ধ্বংস সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং সন্ত্রাসীদের দোসর ভুয়া সাংবাদিকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান। তাদের প্রশ্ন আর কত রক্তের বিনিময়ে এই সন্ত্রাসের রাজত্ব ভাঙবে রাষ্ট্র।



