অপরাধআইন-শৃঙ্খলা

দেশের ভেতর আরেক ভয়ানক দেশ জঙ্গল সলিমপুর

মুহাম্মদ জুবাইর

প্রশাসন সলিমপুর অভিযানে কি পারবে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ভাঙতে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম ভয়ংকর সন্ত্রাসপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।স্থানীয়দের অনেকেই এলাকাটিকে দেশের ভেতর আরেক দেশ বলে আখ্যায়িত করেন আবার কেউ কেউ বলেন এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ঘন জঙ্গল এবং অসংখ্য আঁকাবাঁকা অচেনা পথের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বাভাবিক তৎপরতা এখানে অত্যন্ত কঠিন।ফলে বছরের পর বছর ধরে এলাকাটি কার্যত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেছে বলে বহু অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় ঘেরা বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল বহুদিন ধরেই চোরাচালান অস্ত্র মজুদ মাদক ব্যবসা অপহরণ চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।পাহাড়ের ভেতরে থাকা অসংখ্য গোপন আস্তানা প্রাকৃতিক গুহা এবং সরু পথগুলো এতটাই জটিল যে বাইরের কেউ সহজে প্রবেশ করলে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।এই সুযোগটাই দীর্ঘদিন ধরে কাজে লাগিয়ে আসছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো।

মঙ্গলবার র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান নিজেই স্বীকার করেছেন যে জঙ্গল সলিমপুর একটি সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।তার এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে কারণ দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই এলাকার বিষয়ে একই ধরনের অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন।

হঠাৎ করে সারা দেশে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার মূল কারণ গত ১৯ জানুয়ারি সেখানে পরিচালিত একটি র‍্যাব অভিযান।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে র‍্যাবের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।কিন্তু অভিযানের এক পর্যায়ে ওঁত পেতে থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা র‍্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।এতে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

এই হামলায় র‍্যাবের একজন চৌকস কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন এবং আরও তিনজন র‍্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন।

আহতরা বর্তমানে হাসপাতালে মুমূর্ষ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।এছাড়া ওই সময় কয়েকজন র‍্যাব সদস্যকে জিম্মি করে রাখার ঘটনাও ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে যা পরিস্থিতিকে আরও আতঙ্কজনক করে তোলে।

এই ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রের একটি এলিট বাহিনী যেখানে গিয়ে এমন ভয়াবহ হামলার শিকার হয় সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।বিশেষ করে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাসরত হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের জিম্মিদশায় দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি পথ সম্পর্কে অত্যন্ত অভিজ্ঞ।প্রশাসনের সদস্যরা এলাকা চিনতে না চিনতেই তারা মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গলের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলের অসংখ্য সরু রাস্তা গোপন সুড়ঙ্গ এবং বিকল্প পথ তাদের পালানোর সুযোগ করে দেয়। ফলে অভিযান চালিয়ে কাউকে ধরতে না পারার নজির এখানে নতুন নয়।

মঙ্গলবার ঘটনার প্রেক্ষিতে র‍্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে জানিয়েছে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোরালো অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং আশপাশের এলাকায় তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এবারের অভিযান হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং পরিকল্পিত।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এই জোরালো অভিযান শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে।কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানো মানেই কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া।এই এলাকা শুধু পাহাড়ি নয় বরং সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবেও জটিল। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীরা এখানে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের প্রভাব শুধু অস্ত্রের জোরেই নয় বরং ভয় ভীতি এবং নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও বিস্তৃত।অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ভয় বা বাধ্যবাধকতার কারণে মুখ খুলতে সাহস পান না। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় তথ্য থেকেও বঞ্চিত হয়।

একাধিক সূত্র দাবি করেছে সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি এলাকায় অসংখ্য গোপন ক্যাম্প স্থাপন করেছে যেখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ থাকে।প্রয়োজনে তারা সেখান থেকেই হামলা চালায় এবং আবার আত্মগোপন করে। এসব ক্যাম্প চিহ্নিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

র‍্যাব ডিজি একেএম শহিদুর রহমান বলেছেন সলিমপুরকে আর কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না।তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে শুধু অভিযান নয় এই এলাকার জন্য প্রয়োজন বিশেষ কৌশল দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন।পাহাড়ি পথ চিহ্নিত করা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় ছাড়া সলিমপুরে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

জঙ্গল সলিমপুর এখন আর শুধু একটি এলাকা নয় এটি রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জের নাম।এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রকাশ্য হামলা প্রমাণ করে সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আসন্ন অভিযানের ফলাফলের ওপর।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই জঙ্গল সলিমপুর যেন আর সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল না থাকে। যেন কোনো পরিবারকে আর অস্ত্রের মুখে জিম্মি হয়ে দিন কাটাতে না হয়। রাষ্ট্র তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে এই অঘোষিত দুর্গ ভেঙে দেবে এমনটাই এখন সবাই দেখতে চায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button