র্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড আলিনগর গহীন জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের অবস্থান

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড ২৯ জনের নামসহ মামলা গ্রেফতার এড়াতে আলিনগর পাহাড়ের গহীনে অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আস্তানা অবস্থান
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র্যাব সদস্য হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এজাহারে।ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১৫৪ ধারা অনুযায়ী থানায় দায়ের করা এ মামলায় ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।অভিযোগে বলা হয়েছে,পরিকল্পিতভাবে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের করা এ হত্যা মামলায় দণ্ডবিধির ৩৫৩, ৩৩২, ২২৪, ২২৫, ৩৩৩, ৩০৭, ৩৮৬, ৩৬৪, ৩৪২, ৪২৭, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।মামলার নম্বর ২৪।ঘটনাটি ঘটে ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখ বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটে।যদিও সংবাদ প্রাপ্তির সময় উল্লেখ করা হয়েছে ২২ জানুয়ারি রাত ১২টা ১৫ মিনিট।থানায় এজাহার দাখিলের পর আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ওই দিনই মামলাটি রুজু করা হয়।
এজাহার সূত্রে জানা যায়,ঘটনাস্থল সীতাকুণ্ড থানাধীন ১০ নম্বর জঙ্গল সলিমপুর ইউনিয়নের ০১ নম্বর সমাজ এলাকায়।জনৈক ফয়েজ নামের এক ব্যক্তির কাঠের দোকানের পশ্চিম পাশে আনুমানিক ৩০ মিটার দূরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)এর একটি অঙ্গসংগঠনের কথিত প্রধান কার্যালয়ের সামনে পাকা রাস্তার ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে।স্থানটি থানা থেকে আনুমানিক ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।এলাকা হিসেবে এটি বিট নম্বর-১২ এবং জেএল নম্বর-৬৪-এর আওতাভুক্ত।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে,জঙ্গল সলিমপুরের এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত।পাহাড়ঘেরা দুর্গম এলাকায় বসবাস করে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীচক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও এলাকাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
মামলার অভিযোগকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কাজী আব্দুর রহমান নামের একজন র্যাব কর্মকর্তা। তিনি র্যাব-০৭-এর সদর কোম্পানিতে কর্মরত।এজাহারে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং কর্মস্থলের ঠিকানাও উল্লেখ রয়েছে।অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালনকালে পূর্বপরিকল্পিত হামলার শিকার হন।
এই মামলায় যেসব ধারা যুক্ত করা হয়েছে,সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি কাজে বাধা প্রদান,সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা,বেআইনি আটক,অপহরণ,হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি,ভাঙচুর এবং সর্বোপরি হত্যা।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এই ধারাগুলোর সমন্বয় মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে গেছে।দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এজাহারে মোট ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমেই যাঁর নাম এসেছে তিনি মুহাম্মদ ইয়াছিন ওরফে দস্যু ইয়াছিন,যাকে স্থানীয়ভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।তাঁর বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। তিনি জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল ০১ নম্বর সমাজের বাসিন্দা।
এরপর পর্যায়ক্রমে নূরুল হক ভাঙারি,কালা ইয়াছিন ওরফে জামাই ইয়াছিন, মো. শাহেদ আলী, মেজবাহ, মো. হাজান, মামুন ওরফে বেদ্য মামুন, মো. শাহিন, খলিলুর রহমান, মুহাম্মদ ওমর ফারুক, ইউনুস আলী হাওলাদার, মো. মোরশেদ, মো. নূর হোসেন, কাজী ফারুক ওরফে কালা ফারুক, সালাউদ্দিন, মো. মিজান, মোহাম্মদ শাহিন, মো. শুকুর, ভালা বাচ্চু, মো. ফয়সাল, সাগর, আলম, বেলাল, সাইফুল, সুলতান, জাহিদ, মো. নাহিদ ইসলাম, মো. শাহ আলম ওরফে টুটুল এবং মো. পারভেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এদের অধিকাংশের ঠিকানা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন ছিন্নমূল সমাজ ও আলীনগর এলাকায়। কয়েকজনের স্থায়ী ঠিকানা পটুয়াখালী ও হাটহাজারী হলেও বর্তমানে তারা জঙ্গল সলিমপুরে অবস্থান করছে বলে এজাহারে উল্লেখ আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান,মামলায় উল্লেখিত অধিকাংশ সন্ত্রাসী জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর পাহাড়ের গভীরে বসবাস করছে।সেখানে তাদের স্থায়ী আস্তানা রয়েছে।পাহাড়ের ভেতরে ঢোকার জন্য একাধিক গোপন পথ রয়েছে,যা স্থানীয়দের ছাড়া বাইরের কেউ সহজে চেনেন না।এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,এসব সন্ত্রাসী দলবদ্ধভাবে চাঁদাবাজি, দখলবাজি,মাদক কারবার ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর, অপহরণ বা ভয়ভীতি দেখানো হয়।
র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।এটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের পরিকল্পিত হামলা।আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।
থানা সূত্রে জানা গেছে,এজাহারে উল্লেখিত প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে তদন্ত চালানো হবে। ডিজিটাল প্রমাণ,প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। প্রয়োজনে পাহাড়ি এলাকায় বিশেষ কম্বিং অপারেশন পরিচালনা করা হবে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে।দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।সন্ধ্যার পর মানুষজন প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত এলাকাটি সন্ত্রাসমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
র্যাব সদস্য হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধ নয়,এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত এমনটাই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হলে এটি দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এখন দেখার বিষয়,আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কত দ্রুত এই সংঘবদ্ধ চক্রকে আইনের আওতায় আনতে পারে এবং জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করা সম্ভব হয় কিনা।



