অন্যান্যইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

রহস্যময় লোহার প্রাচীর ও অবাধ্য এক জাতি: জুলকারনাইন ও ইয়াজুজ-মাজুজের ঐতিহাসিক আখ্যান

অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক রিপোর্ট: ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন কিছু ঘটনার সন্ধান মেলে, যা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকেও হার মানায়। তেমনই এক বিস্ময়কর ঘটনা হাজার বছর আগেকার—যখন পৃথিবী শাসন করতেন এক ন্যায়পরায়ণ ও প্রতাপশালী বাদশাহ, জুলকারনাইন। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায় উঠে এসেছে তাঁর এক অভাবনীয় কীর্তি এবং ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ’ নামক এক ভয়ঙ্কর জাতির বন্দিত্বের রোমহর্ষক কাহিনী।

ঘটনাস্থল: দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী জনপদ

কুরআনের সূরা কাহফের বর্ণনা অনুযায়ী, বিশ্বভ্রমণ করতে করতে বাদশাহ জুলকারনাইন এমন একটি স্থানে পৌঁছান, যা ছিল দুটি বিশাল পাহাড়ের মধ্যবর্তী। সেখানকার অধিবাসীরা ছিল অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত। তাদের ভাষা বোঝা ছিল দুষ্কর। কোনোমতে তারা বাদশাহকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, পাহাড়ের ওপাশ থেকে ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ’ নামের এক অসভ্য ও নরখাদক জাতি তাদের ওপর প্রতিনিয়ত হামলা চালায়। হত্যা, লুটতরাজ আর ফসলের ক্ষেত ধ্বংস করে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।

প্রাচীন প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন

নির্যাতিত সেই জনপদ জুলকারনাইনকে অর্থের বিনিময়ে একটি প্রাচীর বা বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্তু নির্লোভ বাদশাহ অর্থ প্রত্যাখ্যান করে কেবল জনবল বা কায়িক শ্রমের সহায়তা চান। তিনি সেখানে এমন এক প্রকৌশল বিদ্যা (Engineering) প্রয়োগ করেন, যা আজও বিস্ময়ের।

তিনি নির্দেশ দিলেন: ১. দুই পাহাড়ের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় বিশাল সব লোহার খণ্ড বা পাত জড়ো করতে। ২. এরপর তাতে প্রচণ্ড আগুন জ্বালিয়ে লোহাকে টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করানো হয়। ৩. সবশেষে সেই উত্তপ্ত লোহার ওপর ঢেলে দেওয়া হয় গলিত তামা (Copper)।

লোহা ও তামার এই রাসায়নিক মিশ্রণে তৈরি হয় এমন এক দুর্ভেদ্য ও পিচ্ছিল ধাতব প্রাচীর, যা ভেদ করা বা ডিঙিয়ে আসা সেই সময় তো বটেই, আজও ইয়াজুজ-মাজুজের পক্ষে অসম্ভব।

বন্দিত্ব ও মুক্তির অন্তহীন চেষ্টা

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই প্রাচীরের ওপাশেই হাজার বছর ধরে বন্দি রয়েছে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস থেকে জানা যায়, তারা প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। যখন তারা সূর্যের আলো দেখার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন তাদের সর্দার বলে, “আজ থাক, আগামীকাল বাকিটা খুঁড়ব।”

কিন্তু তারা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ভরসা করে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে না। ফলে, রাতের বেলাতেই আল্লাহ সেই প্রাচীরকে আবার আগের মতো শক্ত ও ভরাট করে দেন। এভাবেই চলছে হাজার বছরের পুনরাবৃত্তি।

ভবিষ্যদ্বাণী ও চূড়ান্ত পরিণতি

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, কিয়ামতের অন্যতম বড় আলামত হিসেবে একদিন তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ বলবে এবং প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। তখন তাদের সংখ্যা হবে অগণিত। হাদিসে উল্লেখ আছে, তারা এতটাই তৃষ্ণার্ত ও বিধ্বংসী হবে যে, প্রথম দলটি ‘তিবরিয়া হ্রদ’ (Sea of Galilee)-এর সব পানি পান করে ফেলবে। শেষের দলটি এসে শুকনো হ্রদ দেখে বলবে, “এখানে একসময় পানি ছিল!”

পৃথিবীতে তারা যখন চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, তখন হযরত ঈসা (আ.) এবং মুমিনরা তুর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। অবশেষে ঈসা (আ.)-এর দোয়ায় আল্লাহ তাদের ঘাড়ে ‘নাগাফ’ নামক এক প্রকার পোকা সৃষ্টি করবেন, যার আক্রমণে মহামারী আকারে পুরো ইয়াজুজ-মাজুজ জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

পর্যবেক্ষণ

জুলকারনাইনের এই ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক গল্প নয়, বরং এটি ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক বিশ্ব যখন মারণাস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত, তখন জুলকারনাইনের এই প্রাচীর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ও প্রযুক্তি হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ ও সুরক্ষার জন্য। একইসাথে এই ঘটনা কিয়ামতের ভয়াবহতার এক আগাম সতর্কবার্তা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button