অপরাধঅভিযানআইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রামপ্রশাসন

রোকন মেম্বার ও ইয়াসিনের ইশারায় সলিমপুরে সন্ত্রাসের বিস্তার অভিযোগ পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব সদস্য হত্যা মামলায় এজাহারনামীয় পলাতক আসামি মোঃ মিজান এবং এক সন্দিগ্ধ সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব ৭ চট্টগ্রাম।গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে সন্ত্রাস দমন ও অস্ত্রধারী অপরাধীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে র‍্যাব।

অভিযান চলাকালে সেখানে অবস্থানরত কতিপয় সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী র‍্যাব সদস্যদের উপর অতর্কিত ও পরিকল্পিত হামলা চালায়।হঠাৎ এই বর্বর হামলায় চারজন র‍্যাব সদস্য গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন।আহতদের দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজন র‍্যাব সদস্যকে মৃত ঘোষণা করেন।অপর তিনজন র‍্যাব সদস্য বর্তমানে চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।দিনদুপুরে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।ঘটনার ভয়াবহতা ও তাৎপর্যের কারণে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয় এবং দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

এই ঘটনার পরপরই র‍্যাব ৭ চট্টগ্রাম বাদী হয়ে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড থানায় একটি হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলা দায়ের করে।মামলায় ২৯ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয় আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ জনকে।মামলার নম্বর ২৪ তারিখ ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ইং।মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী একাধিক গুরুতর ধারায় অভিযোগ আনা হয় যার মধ্যে সরকারি কাজে বাধা প্রদান সরকারি কর্মচারীর উপর হামলা হত্যাচেষ্টা অপহরণ চাঁদাবাজি ভাঙচুর বেআইনি আটক এবং হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মামলা দায়েরের পর থেকেই র‍্যাব ৭ চট্টগ্রাম পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে ধারাবাহিক অভিযান শুরু করে।এরই অংশ হিসেবে গত ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে মামলার এজাহারনামীয় পলাতক আসামি মোঃ মিজান এবং সন্দিগ্ধ পলাতক আসামি মোঃ মামুনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র‍্যাব।
র‍্যাব সূত্র জানায় যে গোপন সংবাদের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হয় যে মামলার ১৬ নম্বর এজাহারনামীয় পলাতক আসামি মোঃ মিজান চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী থানা এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছে।প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখ আনুমানিক ১৭৫৫ ঘটিকায় র‍্যাব ৭ চট্টগ্রামের একটি অভিযানিক দল খুলশী থানাধীন ইস্পাহানি মোড় এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।অভিযানকালে মোঃ মিজানকে গ্রেফতার করা হয়।গ্রেফতারকৃত মোঃ মিজান বয়স ৫৩ পিতা শাহজাহান মোল্লা প্রকাশ দেলোয়ার হোসেন সাং নরুমপুর থানা শাহরাস্তি জেলা চাঁদপুর।র‍্যাবের দাবি অনুযায়ী তিনি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং র‍্যাব সদস্য হত্যা মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসামি।

এর পরদিন ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখ ভোর আনুমানিক ০৫২০ ঘটিকায় র‍্যাব ৭ চট্টগ্রামের অপর একটি অভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন বগুড়া নিবাস এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।এই অভিযানে সন্দিগ্ধ পলাতক আসামি মোঃ মামুনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত মোঃ মামুনের বয়স ৩৮ পিতা মৃত বোরহান উদ্দিন সাং কালাভানিয়া থানা সন্দীপ জেলা চট্টগ্রাম।র‍্যাব জানায় যে মোঃ মামুন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে ছিলেন এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রেফতারের পর উভয় আসামিকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।র‍্যাব ৭ চট্টগ্রামের পক্ষে সহকারী পরিচালক মিডিয়া সহকারী পুলিশ সুপার এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন এক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন যে র‍্যাব সদস্য হত্যা একটি জঘন্য অপরাধ এবং এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই আইনের বাইরে থাকতে দেওয়া হবে না।পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।এলাকাবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে রোকন মেম্বার ও ইয়াসিন নামের দুইজন কুখ্যাত ব্যক্তি এই এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মূল গডফাদার হিসেবে পরিচিত।তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইশারায় এলাকায় চাঁদাবাজি রাহাজানি মাদক ব্যবসা অবৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ প্রতিদিন ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান যে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রতিদিন সন্ত্রাসীদের আনাগোনা চোখে পড়ে।রাত নামলেই অস্ত্রের ঝনঝনানি মাদক সরবরাহ এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক তৎপরতা বেড়ে যায়।অনেক সাধারণ মানুষ আতঙ্কে মুখ খুলতে সাহস পান না।তাদের দাবি অনুযায়ী এই এলাকায় তিন হাজারের অধিক সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীদের আড্ডা রয়েছে যা পুরো সীতাকুন্ড অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকি।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ রোকন মেম্বার ও ইয়াসিন দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী লালন পালন করে আসছে।এই বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে এবং যে কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর মামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হয়।জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব সদস্য হত্যা ঘটনার পেছনেও এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি এই দুই কুখ্যাত সন্ত্রাসের গডফাদারকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা হলে তাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে।তাদের মতে জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।সন্ত্রাস দমন ও অপরাধীদের গ্রেফতারে যৌথ অভিযান জোরদার করা হবে।র‍্যাব ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং সাধারণ জনগণকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব সদস্য হত্যা মামলায় সাম্প্রতিক গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।তবে স্থানীয়দের মতে এখনো মূল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা।আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলে জঙ্গল সলিমপুর একদিন সন্ত্রাসমুক্ত হবে এমন প্রত্যাশাই এখন এলাকাবাসীর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button