‘হানি ট্র্যাপ’ ও ব্ল্যাকমেইল সিন্ডিকেট: শিলা-হারুন চক্রের আতঙ্কে গুলশান-বনানীর ব্যবসায়ীরা, থানায় জিডি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীতে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বনানী থানায় এই চক্রের মূল হোতা হারুন ও তার সহযোগী শিলার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সুকুন্দ নামের এক ব্যবসায়ী।
এরপরই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এই চক্রের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
বহুরূপী হারুন ও তার প্রতারণার সাম্রাজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটির অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হারুন অর রশিদ (হিরু)। তিনি নিজেকে কখনো যুবদল নেতা, কখনো মানবাধিকার সংস্থার বড় কর্মকর্তা, আবার কখনো পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে নিজের ছবি দেখিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। কখনো নিজেকে ‘যুবদল মহানগর কমিটির নেতা’ আবার কখনো ‘আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে ল্যান্ড কোম্পানির স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং ভুয়া পরিচয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করাই তার মূল পেশা।
সুন্দরী শিলা ও ভয়ংকর ‘হানি ট্র্যাপ’
হারুনের এই প্রতারণা বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার পারভীন শিলা। কখনো মিলা, কখনো লিনা মাহমুদ—এমন নানান নামে তিনি পরিচিত। অল্প বয়সী এই তরুণীকে ব্যবহার করে বড় বড় ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। এরপর চলে প্রেমের অভিনয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শিলা প্রথমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্যবসায়ীদের নিজের বাসায় ডেকে নেন। এরপর কৌশলে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ করে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিং। ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে কাবিনের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মিথ্যা মামলা বা ধর্ষণের অভিযোগ তোলার হুমকি দেন শিলা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “শিলার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। আর এই কাজে তাকে আইনি ও রাজনৈতিক চাদরে মুড়িয়ে সুরক্ষা দেন হারুন।”
ব্যবসায়ীর জিডি ও জিম্মিদশা
সম্প্রতি বনানীর এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে এই চক্র। প্রেমের ফাঁদে ফেলার পর শিলা ও হারুন মিলে ওই ব্যবসায়ীর কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে শিলার ‘বিশ্বস্ত ব্যক্তি’ হিসেবে হারুনকে ওই ব্যবসায়ীর পার্টনার বানানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়, তাও কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই।
টাকা বা পার্টনারশিপ না দিলে মানহানি ও মামলার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই ব্যবসায়ী জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বনানী থানায় জিডি করেছেন।
পুলিশ যা বলছে
এ বিষয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক উপ-কমিশনার জানান, শুধু শিলা বা হারুন নয়, এমন একাধিক চক্র রাজধানীতে সক্রিয়। এরা ধনাঢ্য ব্যক্তি, চাকরিজীবী ও প্রবাসীদের টার্গেট করে। সম্মানের ভয়ে অনেকেই টাকা দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেন।
ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে। নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। আমরা বেশ কিছু সিন্ডিকেটকে আটক করেছি। তবে সবার আগে প্রয়োজন ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং লোভ সংবরণ করা।”



