মুরগি দোকান থেকে “চেয়ারম্যান”পরিচয় ক্ষমতা অর্থ আর সন্ত্রাসে পাঁচথুবী ইউনিয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বিএনপি ত্যাগীর দাবি,আওয়ামী ব্যানারে উত্থান রাহুলের দ্বিমুখী রাজনীতি ঘিরে কুমিল্লায় তোলপাড়
কুমিল্লা নগরীর রাজাগঞ্জ বাজারের এক সময়ের সামান্য মুরগি বিক্রেতা কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল এখন নিজেকে বিএনপির “ত্যাগী নেতা” হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।অথচ তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে আওয়ামী লীগের ব্যানারে,পলাতক এমপি বাহারের জামাই রনির প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়।নামমাত্র ছাত্রদল কর্মী থেকে যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রাহুলের এই রাজনৈতিক রঙ বদলের ইতিহাস ঘিরে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়নে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও আতঙ্ক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,রাজাগঞ্জ বাজারে ছোট একটি মুরগির দোকান দিয়ে জীবন শুরু করা রাহুলের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন কুমিল্লার আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি বাহারের জামাই রনি।তার হাত ধরেই রাহুল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বলয়ে প্রবেশ করেন এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে যুবলীগের ব্যানারে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে আদর্শ সদর উপজেলার ৫নং পাঁচথুবী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড থেকে আওয়ামী লীগের ব্যানারে মেম্বার নির্বাচিত হন রাহুল।স্থানীয়রা বলছেন,এই নির্বাচনের পর থেকেই তার জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসে। সাধারণ দোকানি থেকে তিনি হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী ও বিত্তবান।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের শত শত নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে পাঁচথুবী ইউনিয়নের বিনা ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান মো. হাসান রাফি রাজু মজুমদার আত্মগোপনে চলে যান। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা দখলে নেন রাহুল।
আইন অনুযায়ী তিনি“ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান”হলেও সরকারি ওয়েবসাইট,ব্যানার,পোস্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে সরাসরি “চেয়ারম্যান” হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন তিনি।স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী নির্বাচিত না হয়ে চেয়ারম্যান পরিচয় ব্যবহার করা প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হয়, যা প্রশাসনিক তদন্ত, পদচ্যুতি এমনকি ফৌজদারি মামলার আওতায় পড়তে পারে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাহুলের বিরুদ্ধে ইউনিয়নের সম্পদ দখল ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।এলাকাবাসীর দাবি,চাঁন্দপুর এলাকার শতবর্ষী জলাশয় ভরাট করে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি ফসলি জমির মাটি ও গোমতী নদীর মাটি কেটে বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই অবৈধ অর্থের জোরেই ইউনিয়ন থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে তার ক্যাডার বাহিনী।যারা প্রকাশ্যে তার হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন,হুমকি ও প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষায়,রাহুল এখন একটি মূর্তিমান আতঙ্ক। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিয়ে একাধিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সিন্ডিকেট ভোটকেন্দ্র দখল, প্রতিপক্ষকে হুমকি ও নির্বাচন প্রভাবিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিএনপি ত্যাগী দাবি করলেও আওয়ামী লীগের পক্ষে রাহুলের প্রচারণার ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, পলাতক এমপি বাহারের জামাই রনির সঙ্গে তিনি এখনো নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং রাজনৈতিক পরামর্শ নিচ্ছেন।
সম্প্রতি সাবেক চেয়ারম্যান কাশেমের সঙ্গে প্রকাশ্যে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন রাহুল,যা পাঁচথুবী ইউনিয়নের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল মুঠোফোনে বলেন,“আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।যাচাই-বাছাই করতে চাইলে ৪/৫ জন লোক পাঠান,তাদের বেতন আমি দিবো।
তার এই বক্তব্য নিয়েও এলাকায় নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন যারা বিএনপি করে দীর্ঘদিন নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত,তারা আজও অবহেলিত কেন?আর আওয়ামী লীগের ব্যানারে মেম্বার হওয়া একজন ব্যক্তি কীভাবে হঠাৎ করে বিএনপির ত্যাগী সেজে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হন?
পাঁচথুবী ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ এখন চান রাহুলের রাজনৈতিক পরিচয়, সম্পদের উৎস এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। না হলে দ্বিমুখী রাজনীতির এই দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতে আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।



