অপরাধআইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রামপ্রশাসন

র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যার আসামির প্রকাশ্য হুমকি প্রশ্নবিদ্ধ আইনশৃঙ্খলা পাহাড় নগর জুড়ে আতঙ্ক

মুহাম্মদ জুবাইর

চট্টগ্রামে ২৬ দিনে ১২ খুন প্রকাশ্যে হত্যা লাশ টুকরা পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের রক্তাক্ত রাজত্ব

চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলতি মাসের শুরু থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ২৬ দিনে সংঘটিত হয়েছে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ড।এসব হত্যাকাণ্ডের ধরন ও নৃশংসতা নগরবাসীর মধ্যে ভয় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা গুলি করে হত্যা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা এবং লাশ ছয় টুকরা করে ফেলার মতো ভয়াবহ ঘটনায় কেঁপে উঠেছে পুরো নগর।অথচ এসব ঘটনার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির বদলে আরও প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই ১২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হচ্ছে এক র‌্যাব কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে দিনের আলোতে এভাবে হত্যা করার ঘটনা নগরীর অপরাধ ইতিহাসে বিরল হলেও এই মামলার প্রধান আসামি তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিন এখনো ধরা পড়েননি। উল্টো তাকে ধরতে গেলে প্রকাশ্যে জনবিস্ফোরণের হুমকি দিয়েছেন তিনি।গত ২২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ইয়াসিনকে বলতে শোনা যায় এসব ক্রাইমের ফান্দে পাড়া দিয়া কেউ যদি কোনো ঝামেলা করে তাহলে বড় ধরনের পাবলিক বিস্ফোরণ ঘটবে।একজন পলাতক আসামির এমন হুমকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার পরও প্রধান আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় নগরজুড়ে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসীরা এখন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ভয় করছে না।বরং প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে।এতে করে নগরীর অপরাধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।

চট্টগ্রাম সিতাকুন্ড জঙ্গল সলিমপুর এলাকা বর্তমানে নগরীর সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি দুর্বল বলে অভিযোগ রয়েছে।গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি।পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য এখানকার প্রধান অবৈধ আয়ের উৎস।

এই দখল বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক।এলাকাবাসীর অভিযোগ পুরো পাহাড় অঞ্চল সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে।সাধারণ মানুষ সেখানে কার্যত জিম্মি জীবনযাপন করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ জঙ্গল সলিমপুরে একাধিক অস্ত্র তৈরির কারখানা রয়েছে।দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ধারালো অস্ত্র ও বিস্ফোরক তৈরি করে এসব সন্ত্রাসী চক্র নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে।পাহাড় কেটে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা পাহাড় দখল মাদক কারবার অস্ত্র ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ সব মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এখন একটি অপরাধ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

চলতি মাসে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণঘাতী সহিংসতা।পুলিশের তথ্য অনুযায়ী মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ধাক্কা ও লাঠির আঘাতে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়।এই ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করলেও এলাকাবাসীর প্রশ্ন এ ধরনের সামান্য বিষয় কীভাবে হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। সমাজে সহনশীলতার অভাব এবং অপরাধপ্রবণতার ভয়াবহ রূপ এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অপরাধের মাত্রা যে কতটা বেড়েছে তার আরেকটি উদাহরণ ৪ জানুয়ারি নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় সংঘটিত সোনা ছিনতাইয়ের ঘটনা।দিনের আলোতে রাস্তায় গাড়ি আটকে হাজারী গলির এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩৫০ ভরি সোনা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।এই ঘটনায় নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করলেও এ ধরনের দুঃসাহসিক অপরাধ নগরবাসীর নিরাপত্তাহীনতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

সবচেয়ে নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে নগরের অক্সিজেন শহীদনগর এলাকায়।প্রেমের ফাঁদে ফেলে মো আনিস নামের এক ব্যক্তিকে বা
সায় ডেকে এনে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়।হত্যার পর লাশ ছয় টুকরা করে পলিথিনে মুড়িয়ে খাল ও আশপাশের ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।কয়েক দিন ধরে লাশের অংশ উদ্ধার করে পুলিশ।হাতের আঙুলের ছাপের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।এই ঘটনায় এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।গ্রেপ্তার ওই নারী নিহত আনিসের পূর্বপরিচিত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওই নারী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

ওই নারী দাবি করেছেন তার সঙ্গে থাকা ছবি ব্যবহার করে আনিস তাকে প্রতারণা করছিলেন এবং তার মেয়েকেও উত্ত্যক্ত করতেন।তবে নিহত আনিসের পরিবার দাবি করেছে দুই লাখ টাকা ফেরত না দেওয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।এই ভিন্ন ভিন্ন দাবির মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের পেছনের জটিল সামাজিক ও অপরাধমূলক বাস্তবতা সামনে এসেছে।

এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ জঙ্গল সলিমপুরের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী লাল বাদশা এখনো প্রকাশ্যে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।তিনি বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত আসামি হলেও দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছেন।এলাকাবাসীর প্রশ্ন এত বড় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হয়েও কেন তাকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে লাল বাদশা নিয়মিত পাহাড় দখল করছে এবং তার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রম।

স্থানীয়রা জানান লাল বাদশার অধীনে রয়েছে একাধিক কিশোর গ্যাং।এসব কিশোর গ্যাং ব্যবহার করে চাঁদাবাজি মাদক ব্যবসা হামলা ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।লাল বাদশার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নান্নু এসব কিশোর গ্যাং পরিচালনা এবং মাদক সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে বলে অভিযোগ।নান্নু নিজেকে বড় নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় দাপট দেখাচ্ছে এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধের অভিযোগ থাকলেও এখনো সে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার গণমাধ্যম আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন সম্প্রতি পুলিশ বার্মা সাইফুল এহতেশাম ভোলাসহ বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে।তিনি বলেন মোবারকসহ অন্যান্য পলাতক সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।তিনি দাবি করেন সন্ত্রাসীরা যত বড় বা ক্ষমতাশালী হোক না কেন শেষ পর্যন্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

তবে পুলিশের এমন বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না নগরবাসী।কারণ একের পর এক খুন সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য হুমকি এবং পাহাড় এলাকায় তাদের নিরাপদ আশ্রয় সাধারণ মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। নিহত র‌্যাব কর্মকর্তার স্ত্রী শামসুন্নাহার তার স্বামীর হত্যার প্রধান আসামির প্রকাশ্য হুমকিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন একজন সন্ত্রাসী যদি প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হুমকি দিতে পারে তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়।তার এই প্রশ্ন নগরবাসীর মনের কথাই তুলে ধরেছে।

জঙ্গল সলিমপুর ছাড়াও নগরীর বাকলিয়া ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় দিন দিন বাড়ছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। চাঁদাবাজি মাদক ব্যবসা কিশোর গ্যাং এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় সহিংসতা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

চট্টগ্রাম মহানগরী দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি সেই পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।২৬ দিনে ১২টি খুন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় বরং এটি নগরীর আইনশৃঙ্খলা সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button