উন্মুক্ত ‘এপস্টিন ফাইলস’: ক্লিনটন থেকে হকিং—কাঁপছে অভিজাত বিশ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও ঝড় তুলেছে কুখ্যাত শিশু পাচার ও যৌন নিপীড়ন চক্রের হোতা জেফ্রি এপস্টিনের গোপন নথি বা ‘এপস্টিন ফাইলস’। আদালতের নির্দেশে সম্প্রতি উন্মুক্ত হওয়া এই নথিতে বেরিয়ে এসেছে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, রাজপরিবারের সদস্য, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এবং বিনোদন জগতের মহাতারকাদের নাম। এটি কেবল একজন অপরাধীর গল্প নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাধরদের এক অন্ধকার ও জঘন্য জগতের প্রামাণ্য দলিল।
কী আছে এই ফাইলে? ২০১৫ সালে জেফ্রি এপস্টিন এবং তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে ভার্জিনিয়া জুফ্রে নামের এক ভুক্তভোগী মানহানির মামলা দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর, সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে সেই মামলার হাজার হাজার পৃষ্ঠার গোপন নথি উন্মুক্ত (Unsealed) করা হয়। নথিতে প্রায় ১৫০ জনেরও বেশি হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির নাম ‘জন ডো’ (John Doe) এবং ‘জেন ডো’ (Jane Doe) ছদ্মনামে উল্লেখ ছিল, যা এখন বিশ্ববাসীর সামনে।
রাঘববোয়ালদের তালিকা ও ক্ষমতার সংযোগ ফাইলগুলো উন্মুক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে এর সাথে জড়িত নামগুলো দেখে। সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে থাকা এই কালো জগতের অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন:
- প্রিন্স অ্যান্ড্রু: ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি ভার্জিনিয়া জুফ্রেকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে এসেছে।
- বিল ক্লিনটন: যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এই রাষ্ট্রপতির নাম নথিতে বহুবার এসেছে। জানা গেছে, তিনি এপস্টিনের কুখ্যাত প্রাইভেট জেট “ললিতা এক্সপ্রেস”-এ একাধিকবার ভ্রমণ করেছিলেন।
- ডোনাল্ড ট্রাম্প: সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নামও নথিতে পাওয়া গেছে। তবে সরাসরি কোনো অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ ফাইলে উল্লেখ নেই।
- স্টিভেন হকিং ও মাইকেল জ্যাকসন: বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং এবং পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের নামও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা প্রমাণ করে এপস্টিনের প্রভাব বিজ্ঞান থেকে বিনোদন—সব জায়গাতেই বিস্তৃত ছিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালিকায় নাম থাকা মানেই অপরাধী হওয়া নয়। তবে এটি নিশ্চিত করে যে, অভিজাত সমাজের গভীরে এপস্টিনের জাল কতটা বিস্তৃত ছিল।
‘লিটল সেন্ট জেমস’ ও গোপন ক্যামেরা এপস্টিনের ক্যারিবিয়ান দ্বীপ “লিটল সেন্ট জেমস” ছিল এই অপরাধের মূল কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের কাছে ‘পেডোফাইল আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত এই দ্বীপে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বিমানে করে নিয়ে আসা হতো। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষায় রাখা হতো পাচার হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী অতিথিদের পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে গোপন ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছিলেন এপস্টিন।
প্রধান সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এই বিশাল অপকর্মের পেছনে এপস্টিনের মূল হাতিয়ার ছিলেন ব্রিটিশ ধনকুবেরের কন্যা গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মডেলিং বা ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এই অন্ধকার জগতে টেনে আনতেন তিনি।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রহস্যময় মৃত্যু এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে ভয়ের দিকটি হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখের সামনেই এই চক্রটি পরিচালিত হয়েছে। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি উচ্চ-নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে বিচার শুরুর ঠিক আগেই রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় এপস্টিনের (যাকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়)। বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টিনের এই মৃত্যু অনেক রাঘববোয়ালকে বিচারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
এপস্টিন ফাইলস বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আধুনিক বিশ্বে অর্থের জোর থাকলে কীভাবে আইন ও মানবতাকে পদদলিত করে নিজেদের বিকৃত লালসা চরিতার্থ করা যায়।



