কোতয়ালীতে বিয়ের প্রলোভনে ধর্মান্তরের আশ্বাস গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন নন্দনকানন এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে বিয়ের প্রলোভন ও ধর্মান্তরের আশ্বাস দিয়ে এক গৃহবধূর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী অধ্যাদেশ ২০২৫) এর ৯ খ ধারায় মামলা রুজু করেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।

মামলাটি দায়ের করা হয় ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে। মামলা নম্বর ০৩ এবং বাৎসরিক নম্বর ৫৯।পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণী ও এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার মধ্যে।
ভুক্তভোগী নারীর নাম দেলোয়ারা বেগম,বয়স ৪০ বছর। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায় পরিবারসহ বসবাস করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি জুয়েল দাশ, বয়স ৪৩ বছর। তিনি কোতোয়ালী থানাধীন আন্দরকিল্লা এলাকায় বসবাস করেন।

থানায় দায়ের করা এজাহারের তথ্য অনুযায়ী,দেলোয়ারা বেগমের সঙ্গে অভিযুক্ত জুয়েল দাশের পরিচয় হয় চট্টগ্রাম আদালত এলাকায়।প্রথমে পরিচয় সীমিত ছিল,তবে আদালতের কাজের সূত্র ধরে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়মিত কথোপকথন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের রূপ নেয়।
২০২৫ সালের জুন মাস থেকে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়।তারা মাঝে মধ্যে দেখা করতে থাকেন।এক পর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগী নারীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। তবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় দেলোয়ারা বেগম তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়,প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে ধর্মান্তরিত করে ভুক্তভোগীকে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন।তিনি বারবার বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভবিষ্যতে সংসার করার কথা বলেন। এসব আশ্বাসে ভুক্তভোগী নারী অভিযুক্তের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, অভিযুক্তের কথাবার্তা ও আচরণে তিনি নিশ্চিত হন যে অভিযুক্ত তাকে বিয়ে করবেন।এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন।
সর্বশেষ ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে অভিযুক্তের অনুরোধে ভুক্তভোগী নারী কোতোয়ালী থানাধীন নন্দনকানন এলাকার পুলিশ প্লাজায় সাক্ষাত করতে যান।সেখানে সাক্ষাতের পর অভিযুক্ত তাকে ধর্মান্তরের মাধ্যমে বিয়ে করার চূড়ান্ত আশ্বাস দিয়ে নন্দনকানন এলাকার হোটেল রোজ গার্ডেন আবাসিকের সপ্তম তলার কক্ষ নম্বর ৭০৫ এ নিয়ে যান।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ওই দিন বিকাল আনুমানিক পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিবাহের প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।ভুক্তভোগী নারী অভিযুক্তের প্রতিশ্রুতিতে সরল বিশ্বাস স্থাপন করেই শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি দেন।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী হোটেল থেকে বাসায় ফিরে যান। পরবর্তীতে তিনি অভিযুক্তকে বিয়ে করার বিষয়ে একাধিকবার তাগিদ দিলে অভিযুক্ত তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি তাকে বিয়ে করতে পারবেন না এবং ভবিষ্যতে তার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখতে চান না।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ,অভিযুক্ত ব্যক্তি শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে বিয়ের প্রলোভন ও ধর্মান্তরের আশ্বাস দিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সম্পর্ক অস্বীকার করেন। বিষয়টি আইনত প্রতারণা ও নারী নির্যাতনের শামিল বলে তিনি মনে করেন।
ভুক্তভোগী প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি। পরবর্তীতে পরিবার পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে তিনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ন্যায়বিচারের আশায় তিনি কোতোয়ালী থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত এজাহার দায়ের করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,ভুক্তভোগীর টাইপকৃত লিখিত এজাহার গ্রহণ করে থানার রেকর্ডে মামলা রুজু করা হয়েছে।প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে ঘটনার স্থান,সময়, অভিযুক্তের পরিচয়,অভিযোগের ধরন এবং প্রাসঙ্গিক আইনি ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে কোতোয়ালী থানার একজন সাব ইন্সপেক্টরের ওপর।তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত সংগ্রহ,সাক্ষ্য গ্রহণ এবং অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্তের কাজ শুরু করেছেন।তদন্তের অংশ হিসেবে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আফতাব উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে।তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সম্মতি আদায় করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হলে তা প্রতারণার মাধ্যমে সংঘটিত যৌন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।বিশেষ করে ধর্মান্তরের মতো সংবেদনশীল বিষয় ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জন করলে অপরাধের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
ঘটনার সংবাদ প্রকাশ হতেই চট্টগ্রাম নগরীতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই ভুক্তভোগীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
বিভিন্ন নারী সংগঠনও ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর উল্লেখ করে বলেন, বিয়ের প্রলোভন ও ধর্মান্তরের আশ্বাস দেখিয়ে নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা সামাজিক ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নন্দনকানন হোটেল রোজ গার্ডেন আবাসিক, কোতোয়ালী থানার ওয়ার্ড ৩১ এলাকায় অবস্থিত। থানার দুরুত্ব হলো আনুমানিক ২ কিমি, পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ীর অধীনে। স্থানটি মূল নগরীর ব্যস্ততম এলাকা হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সাধারণত শান্ত থাকে।তবে এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, শহরের ব্যস্ত এলাকা হওয়ায় অনেক সময় হোটেলগুলোতে ব্যক্তিগত কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ কম থাকে।এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে পুলিশকে আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকরা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আলামত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তকারীরা হোটেল কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা ক্যামেরা, এবং সাক্ষীদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। এছাড়া অভিযুক্তের বর্তমান অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগীর মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাকে সহায়তা করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে মামলা নথিভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা এক ধরনের প্রতারণা এবং এটি নারী নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত।ধর্মান্তরের আশ্বাসের মাধ্যমে এমন প্রতারণা সমাজের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি রাখে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন,আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এমন ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনগত কঠোরতার সমন্বয়ে ভবিষ্যতে নারীর অধিকার সুরক্ষিত রাখা যাবে।



