অপরাধএক্সক্লুসিভচট্টগ্রাম বিভাগবিভাগ

চট্টগ্রামে নিজেকে সিংহ পরিচয় দেওয়া পাপ্পি চোরের মত ছাড়লেন দেশ

মুহাম্মদ জুবাইর: বোয়ালখালীর ‘অপরাধের বাদশা’ থেকে কানাডা মনসুর আলম পাপ্পীকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়, আতঙ্কে জনপদ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থেকে কর্ণফুলী,কালুরঘাট হয়ে কানাডা পর্যন্ত বিস্তৃত নানা অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছেন মনসুর আলম পাপ্পী। স্থানীয়দের ভাষায় ‘অপরাধের বাদশা’ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিযোগ, মামলা নথি ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা বোয়ালখালী এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভের আবহ তৈরি করেছে।যদিও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয় এবং স্বতন্ত্র তদন্তে যাচাই হয়নি,তবুও স্থানীয়দের দাবি,দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র এলাকাটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মূল হোতা মনসুর আলম পাপ্পী এবং বর্তমানে তার ব্যবসায়িক ম্যানেজার হিসেবে পরিচিত শিশির মামুন রোকন ও রোকন মামুন শিশির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, বোয়ালখালী, কর্ণফুলী ও কালুরঘাট এলাকায় জাল সনদ ও চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, বিদেশ ভিসা জালিয়াতি, অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীর ঘাট দখল, চাঁদাবাজি, অপহরণ, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, এমনকি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও পাপ্পীর বিরুদ্ধে উঠে এসেছে।এছাড়া পুলিশ পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ড্রেজারের যন্ত্রপাতি দখলের চেষ্টা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাদিকে হুমকি দেওয়া এবং বিদেশে অবস্থান করেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে যুক্ত হয়েছে।মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৫ সালে বোয়ালখালী থানায় এবং ২০১১ সালে ঢাকার নিউমার্কেট থানায় চুরির অভিযোগে মনসুর আলম পাপ্পীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এসব মামলা এখনো আলোচনায় রয়েছে।সাম্প্রতিক সময়ে হাসান বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৯ ও ৩৫ ধারায় মামলা দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, কালুরঘাটের একটি ড্রেজার সাইটে পুলিশ পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে যন্ত্রপাতি চুরির চেষ্টা করা হয়। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে অভিযুক্তরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ও হুমকি দেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আদালতের নির্দেশে পিবিআই তদন্ত করছে।কালুরঘাট এলাকায় সংবেদনশীল স্থানে অনুমতি ছাড়া বালু উত্তোলনের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বন্দর কর্তৃপক্ষ বা জেলা প্রশাসনের কোনো ইজারা ছাড়াই সেখানে বালু উত্তোলন করা হয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন বিপুল অবৈধ আয় হয়েছে। তবে অভিযুক্ত পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে বহু অভিযোগ সঠিকভাবে তদন্ত হয়নি। জানা যায়, মনসুর আলম পাপ্পী একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদেও দায়িত্ব পালন করেন। পৌরসভা মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশায় তার প্রচারণাও চোখে পড়েছিল।বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেলেও স্থানীয়দের দাবি, বিদেশে থেকেও তিনি ফোন ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখছেন। বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ অবৈধভাবে পাচারের অভিযোগও উঠেছে, যদিও এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।জুলাই আন্দোলনের সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ ভুক্তভোগী নাঈমুল রহমান রাব্বি দাবি করেছেন, ওই ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্যাডার বাহিনী জড়িত ছিল। তিনি জাল সনদের মাধ্যমে বিদেশে ভিসা গ্রহণের বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের দাবি জানিয়েছেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতির কারণে তারা মুখ খুলতে পারেননি। এখন অভিযোগগুলো আদালতে আসায় তারা আশাবাদী। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যেন কোনো অপরাধী রেহাই না পায়।প্রতিবেদন বিষয়ে মনসুর আলম পাপ্পীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।সব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন আদালত, তদন্ত সংস্থা ও প্রশাসনের হাতে। তবে জনমতের চাপ একটাই—বিচার হোক, দৃষ্টান্তমূলক বিচার। এ পাপ্পির নামে নতুন করে বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে একাধিক অভিযোগও দিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button