দরিদ্র কৃষকের ছেলে এখন হাজার কোটি টাকার ‘মহারাজা’: কালিয়াকৈরে মজিবুরের ত্রাসের রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক: পিতার নাম শুক্কুর আলী, পেশায় ছিলেন দরিদ্র কৃষক। ছেলে মজিবুর রহমান একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে বড় হয়েছেন। অথচ সেই ‘মজি’ আজ কালিয়াকৈরের হাজার কোটি টাকার মালিক। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র হয়েও গত ১৫ বছর মাফিয়া সরকারের আমলে ছিলেন বহাল তবিয়তে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের ‘ছায়াপুত্র’ হিসেবে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়, আর নিজের দলের নেতাকর্মীদের ওপর চালিয়েছেন স্টিম রোলার।
দ্বৈত রাজনীতির ‘মোজাম্মেল পুত্র’ কালিয়াকৈরে চাউর আছে, মজিবুর রহমান বিএনপির পদধারী নেতা হলেও কার্যত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের ‘ডানহাত’। স্থানীয় বিএনপি নেতারা তাঁকে ঠাট্টা করে ‘মোজাম্মেল পুত্র’ বলেও ডাকেন। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে যখন বিএনপির নেতাকর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত, তখন মজিবুর মন্ত্রীর খাসকামরায় রাত-বিরাতে যাতায়াত করতেন। মন্ত্রীর প্রভাবেই তিনি টেন্ডার বাণিজ্য, ঝুট ব্যবসা, জনবল নিয়োগে অনিয়ম এবং ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করেছেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মোজাম্মেল হক পালালেও তাঁর শূন্যস্থান পূরণে এখন মরিয়া মজিবুর।
শূন্য থেকে হাজার কোটির সাম্রাজ্য মজিবুরের উত্থান অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো। লেখাপড়া শেষে পরিবহন ব্যবসায় নামেন, কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি। এরপর ২০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে পোল্ট্রি খামার দিয়েও লোকসানের মুখে পড়েন এবং ঋণখেলাপি হয়ে যান। জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করে যখন তিনি নিঃস্ব, তখনই ২০০১ সালে বিএনপির তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী তানভীর ছিদ্দিকীর হাত ধরে তাঁর ভাগ্য খোলে। ২০০৪ সালে পৌর প্রশাসক এবং পরবর্তীতে মোজাম্মেল হকের সঙ্গে আঁতাত করে মেয়র হয়েই তিনি পেয়ে যান ‘আলাদিনের চেরাগ’।
দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় অনুসন্ধানে জানা যায়, কালিয়াকৈর ও ঢাকায় মজিবুরের নামে-বেনামে অন্তত ৮টি বহুতল ভবন ও অঢেল সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
বহুতল ভবন: কালিয়াকৈরের লতিফপুরে ২০ কোটি টাকা মূল্যের ১১ তলা ‘এস.টি টাওয়ার’, সফিপুর বাজার সংলগ্ন ৯ তলা ভবন, চান্দরা হরিণহাটিতে ৭ তলা ও ৫ তলা দুটি ভবন, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের ৫ তলা বাড়ি, কালিয়াকৈর বাজারে ৫ তলা সোনালী ব্যাংক ভবন এবং রাবেয়া সখিনা ক্লিনিকের পাশে ৬ তলা ভবন।
ফ্ল্যাট ও আবাসন: রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসে ৩২০০ স্কয়ার ফিটের আলিশান ফ্ল্যাট। কালিয়াকৈরের গোয়ালবাথান মৌজায় ‘হাইটেক মডার্ন টাউন’ নামে বিশাল আবাসন প্রকল্প।
জমি দখল: সরকারি বন ও খাস জমি দখলের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে বক্তারপুর এলাকায় বনের ২৫০ শতাংশ জমি, কালামপুর রেললাইনের পাশে ১১০ শতাংশ এবং লতিফপুরে ১৫০ শতাংশ জমি রয়েছে। এছাড়া স্ত্রী আজমেরি বেগম মুন্নি ও আস্থাভাজন আকরাম আলীর নামে শত শত বিঘা জমি কিনেছেন।
বিদেশি সম্পদ: কানাডায় ছেলে শাহরিয়ার আতিকুর সৌরভ এবং আমেরিকায় মেয়ে মাহফুজা আন্জুম মুনের নামে বিলাসবহুল বাড়ি ও বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ নিয়ন্ত্রণ ও নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন আওয়ামী লীগ আমলে কালিয়াকৈর থানার ‘ছায়া ওসি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন মজিবুর। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিএনপি নেতাদের নামের তালিকা পুলিশের কাছে পাঠাতেন এবং মামলা দেওয়ার সুপারিশ করতেন। তাঁর মতের বিরুদ্ধে গেলেই নেমে আসত ‘মজি বাহিনী’র নির্যাতন। ডিবি হারুন গাজীপুরের এসপি থাকাকালে মজিবুরের দাপট ছিল আকাশচুম্বী। অপহরণ ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তিনি বিরোধী মত দমনের পাশাপাশি জামায়াত নেতাদের মামলা নিয়েও বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমপি হওয়ার স্বপ্ন ও দুদকের নোটিশ বর্তমানে মজিবুরের চোখ জাতীয় সংসদের দিকে। তিনি দম্ভ করে বলে বেড়াচ্ছেন, ধানের শীষের মনোনয়ন পেতে ৫০০ কোটি টাকা খরচ করতেও রাজি তিনি। দলের শীর্ষ নেতাদের ম্যানেজ করতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন।
এদিকে, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১০ মাস আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মজিবুরকে তলব করেছিল। কিন্তু চতুর মজিবুর দুদক ও এনবিআর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তদন্ত প্রক্রিয়া ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক আলমগীর হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।
কালিয়াকৈরের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে মজিবুর এখনো এক মূর্তমান আতঙ্ক। হাজার কোটি টাকার মালিক এই সাবেক মেয়রের দুর্নীতির সাম্রাজ্য কবে ধসে পড়বে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



