চাঁদপুরনির্বাচনরাজনীতি

বহিষ্কার আর কমিটি ভাঙনে বিপর্যস্ত বিএনপি, ফরিদগঞ্জে মাঠে নেই নেতৃত্ব, নেতৃত্বশূন্য দল, সংকটে ধানের শীষ

মো: রাজন পাটওয়ারী

চাঁদপুর–৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে একটি বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে মারাত্মক সাংগঠনিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। ধারাবাহিক বহিষ্কার, কমিটি ভেঙে দেওয়া ও কার্যক্রম স্থগিতের ফলে ফরিদগঞ্জ উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পৌঁছেছে।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথম ধাপে ফরিদগঞ্জ উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় উপজেলা ও পৌরসভা যুবদলের কমিটি। পরে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক শীর্ষ নেতাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে।

চাঁদপুর–৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ও রাজস্ববিষয়ক সম্পাদক লায়ন মো. হারুনুর রশীদ। তবে তাঁর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘চিংড়ি’ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সর্বশেষ কমিটির আহ্বায়ক (বর্তমানে কার্যক্রম স্থগিত) মো. আব্দুল হান্নান।

স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ মো. আব্দুল হান্নানের প্রতি সমর্থন জানালে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ কে এম সলিম উল্যাহ সেলিমের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ফরিদগঞ্জ উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপির সব কার্যক্রম নতুন কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল হান্নানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৮ জানুয়ারি যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে ফরিদগঞ্জ উপজেলা ও পৌরসভা যুবদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।

এরপর ৩১ জানুয়ারি একদিনেই একাধিক বহিষ্কারের ঘোষণা আসে। জেলা বিএনপির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. মঞ্জিল হোসেন পাটওয়ারী, পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. আমানত গাজী এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ফারুক আহমেদ খানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

একই দিনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান মঞ্জু ও সদস্য সচিব আবু ইউসুফ চৌধুরী শাওনকে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দলের উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব মো. ফারুক হোসেনসহ আরও চারজন নেতাকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়।

এত সংখ্যক নেতা বহিষ্কার ও কমিটি বিলুপ্তির ফলে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলো সাংগঠনিকভাবে এক ধরনের শূন্যতায় পড়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি এমন পরিস্থিতির মুখে আগে কখনো পড়েনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তৃণমূলের বাস্তবতা ও নেতাকর্মীদের মনোভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। মো. আব্দুল হান্নানের প্রতি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্থা ও সমর্থন উপেক্ষা করায় বিএনপি এখন সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

তাঁদের মতে, ধারাবাহিক ও ব্যাপক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়েছে, যা নির্বাচনে ধানের শীষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, এতদিন দলীয় শৃঙ্খলার কারণে যারা প্রকাশ্যে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারেননি, বহিষ্কারের মাধ্যমে সেই বাধাও সরে গেছে। ফলে চাঁদপুর–৪ আসনে বিএনপির সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button