বেতন ৪০ হাজার, ঢাকায় ৩ বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: নিরাপদ পানি প্রকল্পে প্রকৌশলী আনোয়ারের ‘সিন্ডিকেট রাজত্ব’

স্টাফ রিপোর্টার: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ’ শীর্ষক ৯ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পটি এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে এক এস্টিমেটর (প্রাক্কলনিক) ও তাঁর সিন্ডিকেটের কাছে। ৪০ হাজার টাকা বেতনের এই কর্মকর্তার নাম আনোয়ার হোসেন সিকদার। সরকারি চাকরি করেও স্ত্রীর নামে খুলেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, আর টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে ঢাকায় গড়েছেন তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ অঢেল সম্পদ।
অভিযোগ রয়েছে, আনোয়ার সিকদার এবং তাঁর আস্থভাজন ঠিকাদার ও কয়েকজন জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর যোগসাজশে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। টেন্ডার জালিয়াতি, রেট ফাঁস এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
৪০ হাজার টাকা বেতনে বাদশাহী জীবন ডিপিএইচই সূত্রে জানা যায়, ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা আনোয়ার সিকদারের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা। দুটি ইনক্রিমেন্টসহ সব মিলিয়ে মাসে তিনি পান সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা। অথচ তাঁর জীবনযাপন হার মানায় বড় শিল্পপতিদেরও।
বিলাসবহুল গাড়ি ও ফ্ল্যাট: তিনি চলাফেরা করেন ৪০ লাখ টাকা দামের ব্যক্তিগত গাড়িতে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ের ‘খ’ ব্লকে স্ত্রীর নামে কিনেছেন কোটি টাকা মূল্যের আলিশান ফ্ল্যাট।
ধানমন্ডি ও সাভারে সম্পদ: ধানমন্ডি ৬ নম্বরের ৭৮নং বাসায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে বিশাল ফ্লোর এবং সাভার পৌরসভা সংলগ্ন এলাকায় স্ত্রীর নামে ৫ তলা বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে।
গ্রামের বাড়ি: টাঙ্গাইলের টেংগুরিয়া উপজেলার আরোহ সালিনা গ্রামে ১০ বিঘা জমি ও বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। এছাড়া গোপালগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর পাইপ ফ্যাক্টরিতে তাঁর বড় অংকের বিনিয়োগ রয়েছে। বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
টেন্ডার জালিয়াতির কৌশল: ‘রেট’ বিক্রি ও সিন্ডিকেট প্রকল্পের এস্টিমেটরের দায়িত্বে থাকায় আনোয়ার সিকদার টেন্ডারের গোপন ‘রেট’ বা প্রাক্কলিত মূল্য আগেই তাঁর পছন্দের ঠিকাদারদের কাছে ফাঁস করে দেন। ১. গোপালগঞ্জে অনিয়ম: সমপ্রতি গোপালগঞ্জে ১৫ কোটি টাকার সোলার প্যানেল স্থাপনের টেন্ডারে ‘সালেক সোলার লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে অন্য ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ করতে বাধা দেওয়া হয়। এছাড়া, অন্য একটি টেন্ডারে সর্বনিম্ন তিন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ৪র্থ অবস্থানে থাকা ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’কে ৯ শতাংশ অধিক দরে (সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৪ কোটি টাকা বেশি) কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। ২. পাহাড়ী জেলায় লুটপাট: খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও একই চিত্র। নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানি ছাড়া অন্য কেউ যাতে অংশ নিতে না পারে, সেজন্য টেন্ডারের শর্ত ও প্যাকেজ সাজানো হয়। বান্দরবানে ১৫০০ এফআরপি ভেসেল এবং খাগড়াছড়িতে ৩০০০ ব্যাসেলের টেন্ডারে ‘মনির ইঞ্জিনিয়ারিং’কে কাজ দিতেই সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।
নিজেই যখন ঠিকাদার সরকারি চাকরিতে থেকে ব্যবসা করা নিষিদ্ধ হলেও আনোয়ার সিকদার নিজের স্ত্রীর নামে লাইসেন্স করে ঠিকাদারি ব্যবসা চালাচ্ছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দম্ভভরে বলেন, “হ্যাঁ, আমার স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে। আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কিছু কাজ করেছি। এটি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়েই করা যায়।”
তবে এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়াল স্পষ্ট জানান, “সরকারি চাকরি করে ঠিকাদারি করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ করে থাকলে তা চাকরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের অসহায়ত্ব আনোয়ার সিকদারের দাপটে কোণঠাসা মাঠ পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, পিডি অফিস থেকে আনোয়ার সিকদারই সব ঠিক করে দেন। টেন্ডার আহ্বানের আগেই তিনি পছন্দের ঠিকাদারকে রেট দিয়ে দেন। ফলে অনেক সময় একই ঠিকাদার সব কাজ পেয়ে যায়, যা নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। গোপালগঞ্জ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়েজ আহমেদ বলেন, “পিডি অফিস যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, আমি সেভাবেই টেন্ডার করেছি। এখানে আমার কোনো হাত নেই।”
দুদকের মামলা ও অদৃশ্য হাত আনোয়ার সিকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা চলমান এবং চার্জশিটও হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের আগে ‘আর্সেনিক প্রকল্প’ ও ‘৩৭ পৌরসভা প্রকল্পে’র দায়িত্বে থেকেও তিনি ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছেন।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২০ সালে একনেকে পাস হওয়া এই প্রকল্পটি এখন আনোয়ার সিন্ডিকেটের পকেটে। স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত এই টেন্ডারগুলো বাতিল করে স্বচ্ছতার সাথে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হোক এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।



