দুর্নীতি

রূপগঞ্জ পূর্ব সাব-রেজিস্ট্রি অফিস: সাব-রেজিস্ট্রার ‘পুতুল’, সহকারী মোহরার আমিনুলের ইশারায় চলে দুর্নীতির রাজত্ব

স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ পূর্ব সাব-রেজিস্ট্রি অফিস যেন দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আর এই অনিয়মের মূল কারিগর খোদ অফিসের সহকারী মোহরার আমিনুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, পদবিতে ছোট হলেও ক্ষমতার দাপটে তিনিই অফিসের ‘অঘোষিত সাব-রেজিস্ট্রার’। তার ইশারা ছাড়া ফাইলে কলম ছোঁয়ান না খোদ সাব-রেজিস্ট্রারও। ঘুষ, জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার মাধ্যমে আমিনুল এই অফিসকে বানিয়ে ফেলেছেন নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসার কেন্দ্র।
কথায় আমিনুল, কাজে দুর্নীতি সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, এই অফিসে আমিনুল ইসলামের কথাই শেষ কথা। দলিলের ফাইলে তার দেওয়া ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ বা সিগন্যাল না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার কোনো দলিল সই করেন না। একটি সাধারণ দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলেও আমিনুলকে দিতে হয় ৯ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। আর দলিলে সামান্য ত্রুটি বা এনআইডিতে নামের বানান ভুল থাকলে তো কথাই নেই; শুরু হয় আমিনুলের ব্ল্যাকমেইল। ত্রুটির অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের মনে ভীতি সঞ্চার করে দলিল প্রতি ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শ্রেণি পরিবর্তন ও সরকারি জমি লোপাট আমিনুলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া। মোটা অংকের গোপন চুক্তিতে তিনি মূল্যবান ‘নাল’ বা ‘ভিটি’ জমিকে কাগজে-কলমে ‘ডোবা’ বা ‘পতিত’ দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন করাচ্ছেন। এতে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। শুধু তাই নয়, ভলিউম টেম্পারিং ও ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে সরকারি খাস খতিয়ান এবং অর্পিত সম্পত্তি (ভিপি/এপি) ব্যক্তি মালিকানায় কিংবা বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির নামে লিখে দেওয়ার মতো ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সাংকেতিক চিহ্নে ঘুষ বাণিজ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, দলিলের ফাইলে আমিনুলের দেওয়া বিশেষ ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ দেখলেই সাব-রেজিস্ট্রার বোঝেন যে, ঘুষের টাকা আদায় হয়েছে। তখন তিনি চোখ বন্ধ করে দলিলে স্বাক্ষর করেন। সেরেস্তা খরচ, বড় স্যারের নাম ভাঙিয়ে (ডিআর অফিসের জন্য ১ হাজার টাকা) এবং নাস্তা খরচের নামে দলিল প্রতি ১০% হারে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা এই সিন্ডিকেটের অলিখিত নিয়ম।
ভুক্তভোগীর বয়ান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমার এনআইডি কার্ডে সামান্য নামের ভুল ছিল। সরকারি ফি দেওয়ার পরও আমিনুল আমার কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অতিরিক্ত এক লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছে। টাকা না দিলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এই জমি কস্মিনকালেও রেজিস্ট্রি হবে না।”
শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও টাকার ভাগ-বাটোয়ারা আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এতে রয়েছে মোহরার, এক্সট্রা মোহরার, উমেদার, দলিল লেখক সমিতির কতিপয় নেতা এবং স্থানীয় দ্বিতীয় সারির কিছু রাজনৈতিক নেতা। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন অবৈধভাবে আদায়কৃত লক্ষ লক্ষ টাকার ৫০% যায় সাব-রেজিস্ট্রারের পকেটে, ৩০% রাখেন আমিনুল নিজে, আর বাকি ২০% অফিস স্টাফ, ডিআর অফিস ম্যানেজ ও রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে বন্টন করা হয়। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কারো পক্ষে জমি রেজিস্ট্রি করা অসম্ভব।
তদন্তের দাবি স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এই দুর্নীতিবাজ চক্রের লাগাম এখনই টেনে ধরা দরকার। তাদের দাবি, সন্ধ্যার পর অফিস ত্যাগের আগ মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম যদি আকস্মিক অভিযান চালায়, তবেই হাতেনাতে ঘুষের টাকাসহ আমিনুল ও তার সহযোগীদের ধরা সম্ভব হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button