১২ হাজার টাকা বেতনের পেশকার এখন কোটিপতি: কোটা ও প্রভাবে মেহেদী হাসানের ‘রাজসিক’ উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেতন স্কেল অনুযায়ী সাকুল্যে বেতন পান ১২ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। অথচ তিনি চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে, ঢাকায় রয়েছে ১০ তলা ভবনের মালিকানা, আর গ্রামে আচরণ করেন যেন এনবিআরের কোনো জাঁদরেল কর্মকর্তা। তিনি মেহেদী হাসান (জুয়েল), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল ৩/৪৮-এর একজন সামান্য পেশকার। মাত্র ৬ বছরে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বনে গেছেন কোটি টাকার মালিক।
কোটা ও দলীয় প্রভাবে পারিবারিক নিয়োগ টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের ভেঙ্গুলা গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের (ফটু) ছোট ছেলে মেহেদী হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহার করে মেহেদী হাসান এবং তাঁর ভাই-বোনকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়।
বড় ভাই সোহেল এবং বোন ফাতেমা কোটা সুবিধায় গোপালপুর ভেঙ্গুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এলাকাবাসীর দাবি, তাদের চেয়ে অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকলেও কেবল দলীয় বিবেচনায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
মেহেদী হাসান ২০১৯ সালে এনবিআরের পেশকার পদে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলের তৎকালীন এক সংসদ সদস্যের সুপারিশে তিনি এই চাকরি বাগিয়ে নেন।
আলাদিনের চেরাগ ও সম্পদের পাহাড় চাকরিতে যোগদানের মাত্র ৬ বছরের ব্যবধানে মেহেদী হাসানের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে অবিশ্বাস্যভাবে। অনুসন্ধানে তাঁর বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে:
ঢাকায় ফ্ল্যাট: রাজধানীর আগারগাঁও ৬০ ফিট রাস্তার পাশে পীরেরবাগে (২২০/২/১) ১৬ কাঠা জমিতে নির্মিত ১০ তলা ভবনের ১৮ জন মালিকের মধ্যে একজন এই পেশকার মেহেদী হাসান।
গাড়ি ও জমি: তিনি চলাচলের জন্য ব্যবহার করেন অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করা একটি দামি বিলাসবহুল গাড়ি। এছাড়া গোপালপুর, টাঙ্গাইল সদর ও ঢাকায় নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি ও প্লট কিনেছেন।
আয়ের উৎস: অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি দিতে সহায়তা করেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘুষ আদায় করেন। এভাবে তিনি সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করে নিজের পকেট ভারি করেছেন।
গ্রামে ‘ভিআইপি’ আচরণ ও হুমকি গ্রামের বাড়িতে গেলে মেহেদী হাসানের চলাফেরা দেখে মনে হয় তিনি এনবিআরের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকার বদল হলেও তাঁর দাপট কমেনি। কেউ তাঁর আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুললে বা সাংবাদিকরা তথ্য জানতে চাইলে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা মারমুখী আচরণ করেন। তিনি ফোনে হুমকি দিয়ে বলেন, “এগুলো করে আমার কিছুই হবে না, আপনাদের দেখে নেব।”
কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও তদন্তের আশ্বাস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মেহেদী হাসান নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী মনে করেন এবং কাউকে তোয়াক্কা করেন না। তবে তাঁরা স্পষ্ট করেন, “কারও ব্যক্তিগত অপরাধ বা দুর্নীতির দায়ভার প্রতিষ্ঠান নেবে না।”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, “বিগত সরকারের আমলে যারা ভুয়া সনদ বা অবৈধ পন্থায় কোটা সুবিধা নিয়েছেন, তাদের তালিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, “গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতির সংবাদ আমরা পর্যালোচনা করছি। অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিললে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযুক্তের নীরবতা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কর অঞ্চল ৩/৪৮-এর পেশকার মেহেদী হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।



