চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রতীক ওসমান গনি সেগুন

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম কাঁপানো সন্ত্রাসী ওসমান পতেঙ্গা হত্যাকাণ্ডে এজাহারভুক্ত নগরজুড়ে আতঙ্কের রাজত্ব গুলির রাজনীতি সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য ওসমান গনি সেগুনের ইশারায় ঝরল সারোয়ার বাবলা ও আলী আকবরের রক্তচট্টগ্রাম নগরী যেন আবারও ফিরে গেল রক্ত আর বারুদের শাসনের যুগে।প্রকাশ্যে অস্ত্রের ঝনঝনানি গুলির শব্দ আর লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।এই ভয়াবহ বাস্তবতার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক আতঙ্কের নাম ওসমান গনি সেগুন।পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের ভাই হিসেবে পরিচিত এই ওসমান গনি সেগুনের নাম এবার সরাসরি উঠে এসেছে একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এজাহারে।২৩ মে ২০২৫ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সী-বিচ এলাকায় যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তা নগরবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।পর্যটন এলাকা নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি গুলিতে ঝাঁঝরা করে হত্যা করা হয় ইট বালির ব্যবসায়ী আলী আকবর আকবরকে।ঘটনার এজাহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এই হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত ঠান্ডা মাথার খুন।বাদী রুপালী বেগমের দায়ের করা এজাহারে ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয় যার মধ্যে ছয় নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছে ওসমান গনি সেগুন।স্থানীয়রা বলছেন এই নামটি শুধু একটি ব্যক্তির নাম নয় এটি একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রতীক।ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী সেদিন সন্ধ্যায় পর্যটন পুলিশ বক্সের অদূরে জেলা প্রশাসনের লিজ দেওয়া ২৮ নম্বর দোকান ধাবা রেস্তোরার সামনে আগে থেকেই অস্ত্র হাতে ওৎ পেতে ছিল আসামিরা।সুযোগ পেয়েই তারা আলী আকবরকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয় তার হাত পা বুক গলা শরীরের একাধিক অংশ।রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি।এই বর্বর হামলায় শুধু আলী আকবরই নয় গুলিবিদ্ধ হয় পথচারী জান্নাতুল বাকী এবং শিশু রাতুল ইসলাম মাহিন। পর্যটন এলাকায় শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।স্থানীয় সূত্র বলছে ওসমান গনি সেগুনের ইশারায় চলে এই পুরো অপারেশন।দীর্ঘদিন ধরেই আলী আকবরের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের বিরোধ চলছিল।ব্যবসা বাণিজ্য আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদা নিয়েই এই দ্বন্দ্ব ছিল বলে অনেক দিনের অভিযোগ।শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হলো জীবন দিয়ে।ওসমান গনি সেগুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়।অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি জমি, দখল , কিশোর গ্যাং তৈরির কারিগর,সন্ত্রাসী বাহিনী লালন পালন, এসব অভিযোগ নতুন নয়।নগরীর বায়েজীদ বোস্তামী খুলশী চান্দগাঁও হাটহাজারী , রাউজান এলাকায় তার নাম শুনলেই মানুষ আতঙ্কে দরজা বন্ধ করে দেয়।একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন সেগুনের লোকজন যা খুশি তাই করে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।পুলিশও অনেক সময় নীরব থাকে বলে অভিযোগ।এই ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বড় সাজ্জাদ সিন্ডিকেট।পুলিশি তথ্য অনুযায়ী ওসমান গনি সেগুন দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে।বড় সাজ্জাদের নির্দেশনায় নগরীতে একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।এই সিন্ডিকেটের ভয়াবহতা বোঝা যায় ৫ নভেম্বরের আলোচিত হত্যাকাণ্ডে।ওই দিন চট্টগ্রাম নগরের চালিতাতলী হাজির পোল এলাকায় বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগ চলাকালে গুলিতে নিহত হন মহানগর বিএনপি কর্মী সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা। সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও উঠে আসে ওসমান গনি সেগুনের নাম।স্থানীয়রা জানান বাবলা একসময় ভুল পথে থাকলেও জেল থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন।রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ভালো পথে চলতে চেয়েছিলেন।কিন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে ছাড়েনি।পেছন থেকে পিস্তল ঠেকিয়ে একের পর এক গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।সেই ঘটনার পর থেকেই বাবলার পরিবার সন্ত্রাসীদের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।এখন প্রশ্ন উঠছে আলী আকবর হত্যাকাণ্ড কি একই সন্ত্রাসী ধারাবাহিকতার অংশ।তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।এদিকে ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানাধীন ইমপেরিয়াল হাসপাতাল এলাকা থেকে ওসমান গনি সেগুনকে আটক করেছে পুলিশ।আটকের পর তাকে মনসুরাবাদ ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।এই খবরে নগরজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর জোনের উপ কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন আমরা বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি।যদিও এই বক্তব্যকে অনেকেই দায়সারা বলে মন্তব্য করেছেন।কারণ নগরবাসীর দাবি শুধু খোঁজ নিলে হবে না এই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য ভেঙে ফেলতে হবে।নিহত আলী আকবরের স্ত্রী রুপালী বেগম বলেন আমার স্বামীকে প্রকাশ্যে গুলি করে মেরে ফেলেছে।এখন আমি আমার সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে আছি।আমি চাই এই সন্ত্রাসীদের ফাঁসি হোক।আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ৩৪ ধারায় মামলা হওয়ায় এটি একটি ভয়াবহ অপরাধ।যদি প্রভাবশালীদের চাপ উপেক্ষা করে সঠিক তদন্ত হয় তাহলে এই মামলাই চট্টগ্রামের সন্ত্রাস দমনের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।চট্টগ্রামবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন ওসমান গনি সেগুন কি এবার সত্যিই আইনের মুখোমুখি হবে নাকি আগের মতোই অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় আবারও বেরিয়ে যাবে।নগরবাসী চায় আতঙ্কের রাজত্বের অবসান।তারা চায় সী বিচ পর্যটন এলাকা হোক নিরাপদ রক্তে ভেজা নয়।এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ জানিয়েছে তদন্ত চলমান।(ধারাবাহিক পর্বের দ্বিতীয় পর্ব)



