দুর্নীতি

রাজউকে লিটন সরকারের ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’: এক কর্মকর্তার কবজায় কি জিম্মি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)—নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় যে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতার প্রতীক হওয়ার কথা, সেটি কি এখন এক ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণে? রাজউকের গুলশান এস্টেট ও ভূমি-৩ শাখার উপ-পরিচালক মো. লিটন সরকার (আইডি-১৭১৪৯)-কে ঘিরে ওঠা একের পর এক গুরুতর অভিযোগ এখন রাজউকের অন্দরে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দমননীতির মাধ্যমে তিনি এক ‘অদৃশ্য বলয়’ তৈরি করেছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

ফাইল নিষ্পত্তি ও জমি বরাদ্দে ‘দরজার নিয়ম’ রাজউকের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, গুলশান এলাকার জমি বরাদ্দ, ইজারা, নিলাম ও ফাইল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রাজউকের প্রচলিত আইনের চেয়ে ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ’ বেশি প্রভাবশালী। ভুক্তভোগী নাগরিকদের মধ্যে প্রচলিত একটি প্রবাদ এখন রাজউক ভবনে ঘুরপাক খাচ্ছে: “রাজউকে জমি চাইলে আগে আইন নয়, সঠিক দরজা চিনতে হয়।”

এই ‘দরজার নিয়ম’ বা গোপন সমঝোতা ছাড়া গুলশান এস্টেটের কোনো ফাইল নড়ে না বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। সিন্ডিকেট বাণিজ্য ও কোটি টাকার লেনদেন অনুসন্ধানে মিলেছে এক অঘোষিত ‘কন্ট্রাক্ট সিন্ডিকেট’-এর তথ্য। প্রভাবশালী ঠিকাদার ও রাজনৈতিক মহলের যোগসাজশে মূল্যবান প্লট, পরিত্যক্ত ভবন এবং রাষ্ট্রীয় ভূমি নিয়ে এক বিশাল বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে লিটন সরকারের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ১: গোপন রেজিস্ট্রেশন ও নথিপত্র ম্যানিপুলেশন করে অবৈধ দখলকে বৈধতা দান।
অভিযোগ ২: কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু পক্ষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান।
অভিযোগ ৩: রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

দাপ্তরিক শুদ্ধাচার ও মাদক সেবনের বিস্ফোরক অভিযোগ সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে লিটন সরকারের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে। একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, এই কর্মকর্তা অফিস চলাকালীন মাদক (ফেনসিডিল) সেবন করেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল পদের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং এটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি।

ভয়ের সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক দমন রাজউকের ভেতরে যারা এই অনিয়মের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন, তাদের কপালে জুটেছে বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। পরিকল্পিতভাবে সৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নাম ছড়িয়ে তাদের কোণঠাসা করার একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এক ধরনের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বিরাজ করছে, যেখানে নিয়ম নয়—ব্যক্তির ইচ্ছাই শেষ কথা।

নাগরিক হয়রানি ও জবাবদিহিতার সংকট সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, গুলশান এস্টেট শাখার গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। অকারণে নোটিশ প্রদান এবং অযৌক্তিক হয়রানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে গুলশান এলাকার অত্যন্ত মূল্যবান কিছু প্লট ও পরিত্যক্ত ভবনের মালিকানা সংক্রান্ত নথিতে রহস্যজনক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

উপসংহার: নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ?


এত অভিযোগ এবং নথিভিত্তিক অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো দৃশ্যমান তদন্ত শুরু হচ্ছে না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন নাগরিক সমাজ। অভ্যন্তরীণ নজরদারি ব্যবস্থা কি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি? রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হয়, তবে জনগণের আস্থা চূড়ান্তভাবে ধসে পড়বে। এখন সময় এসেছে দেখার—রাজউক কি সংস্কারের পথে হাঁটবে, নাকি দুর্নীতির ছায়ায় বিলীন হবে?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button