টঙ্গী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস: সাইনবোর্ডে ‘দুর্নীতিমুক্ত’, বাস্তবে ‘মিস্টার ৫%’ ওসমানের নেতৃত্বে ঘুষের মহোৎসব

প্রতিবেদক: মামুন খান
গাজীপুর: ‘এ অফিস দুর্নীতিমুক্ত’—টঙ্গী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দেওয়ালে ঝুলছে এমন একটি নজরকাড়া সাইনবোর্ড। তবে ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে কর্মচারীদের মুখ থেকে কথা বের করতেও টাকার প্রয়োজন হয়। ওপর মহলের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা। টেবিলে টাকা ফেললেই মেলে সেবা, আর ঘুষ না দিলে নড়ে না ফাইল।
রাজধানী ঢাকার লাগোয়া টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম, পূবাইল এবং গাছা—এই চারটি মেট্রোপলিটন থানার জমিজমা ও স্থাপনার দলিল সম্পাদন হয় এই গুরুত্বপূর্ণ অফিসে। তবে শিল্পাঞ্চল ও নগরায়নের কেন্দ্রবিন্দু এই কার্যালয়টি এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
ছয় কোটি টাকার দলিল ও ওসমানের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ গত ১৬ জুলাই টঙ্গীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামাল অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) যাওয়ার পর, কিছুদিন কালিগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কাপাসিয়া সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গনি মন্ডলকে টঙ্গীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সপ্তাহে মাত্র তিনদিন দায়িত্ব পালন করা ওসমান গনি এই অফিসকে রীতিমতো ‘বাণিজ্যের হাটবাজারে’ পরিণত করেছেন। ওসমান গণি তিনি তার অফিসে দলিল প্রতি ৫% ঘুষের টাকা বরাদ্দ রাখার জন্য দলিল লেখকদের বাধ্য করেন। যার কারণে সব জায়গায় তিনি ‘মিস্টার ৫% ওসমান’ নামেও পরিচিত হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দুর্গাপূজার ছুটির ঠিক আগে ভেন্ডার সমিতির সিন্ডিকেটের সহায়তায় ৬ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি জমির দানপত্র দলিল রেজিস্ট্রির মিশন ছিল ওসমানের। অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে সেটি আটকে গেলেও বর্তমানে তা সম্পাদনের জোর দেনদরবার চলছে।
ওসমান গনি মন্ডল ২০২২ সালে পাবনা থেকে বদলি হওয়ার পর স্ত্রীর চিকিৎসার কথা বলে ১৭টি প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কাপাসিয়ায় পোস্টিং নেন। তার মূল লক্ষ্যই ছিল লোভনীয় টঙ্গী রেজিস্ট্রি অফিস।
সমিতিকে নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য বর্তমান ‘বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ নিয়েও চরম অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন ওসমান গনি। তিনি দম্ভভরে বলেন, “বর্তমান কমিটিতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা প্রতিদিন সন্ধ্যায় গুলশানের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে বদলি বাণিজ্য করে। এই পকেট কমিটিতে আমাকে সাথে না রাখলে কমিটিই হতো না।”
শত কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় চাকরি জীবনে প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট ওসমান গনি মন্ডল নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের তালিকার মধ্যে রয়েছে:
- উত্তরায় ফ্ল্যাট: সেক্টর-১২, রোড-১৬, বাসা-২৬ নম্বরে দুটি ফ্ল্যাট।
- ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ফ্ল্যাট: বাইলজুরি মৌজায় দুটি ফ্ল্যাট।
- শ্রীপুরে জমি: গাজীপুরের শ্রীপুরে স্ত্রীর নামে কেনা জমি ও প্লট।
- বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স: ভুরুঙ্গামারি উপজেলার নিজ গ্রামে আধুনিক সাজসজ্জা ও দামি আসবাবপত্রে সজ্জিত ডুপ্লেক্স বাড়ি।
- বিপুল ভূ-সম্পত্তি: ভুরুঙ্গামারির মইদাম মৌজায় ৮৭৭ শতক জমি।
ভেন্ডার সমিতির সিন্ডিকেট ও হয়রানির চিত্র গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও এই অফিসের সিন্ডিকেটে কোনো পরিবর্তন আসেনি; কেবল খোলস পাল্টেছে। এই সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক তিনজন—দলিল লেখক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হোসেন বকুল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান স্বপন।
তাদের ইশারা ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রারের কলম ঘোরে না। অফিস শেষে সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরায় চলে ঘুষের টাকার ভাগবাঁটোয়ারা। এছাড়া রেকর্ড কিপারের নকল তল্লাশিতে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং নৈশপ্রহরী হান্নানের অসদাচরণে অতিষ্ঠ সেবাগ্রহীতারা। বেলা ১১টায় দলিল জমা দিলে সিরিয়াল পেতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত ফি না দিলে দলিল আটকে রেখে হয়রানি করা নিত্যদিনের রুটিন।
এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৫-এর জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা বিতর্কিত ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদধারী আবু হেনা মোস্তফা কামালের আমলেও একই রকম লুটপাট চলেছে। বর্তমানে ওসমান গনির নেতৃত্বে সেই ধারা আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে।
এসব পাহাড়সম অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।



