উন্নয়ন বঞ্চিত গাইবান্ধার দুঃখ কথা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ উত্তরের জেলা গাইবান্ধা। স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরির ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ”—এই স্লোগানেই গাইবান্ধা জেলা পরিচিতি পেলেও উন্নয়নের মানচিত্রে বার বার পিছিয়ে পড়ছে এ জনপদ। শিল্পকারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব খাতেই দীর্ঘ দিনের কাঙ্খিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে এ জেলার মানুষ। বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের মাঝেও জেলার চরাঞ্চলগুলো জুড়ে লুকিয়ে আছে কৃষি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা। যার সঠিক বিকাশ ঘটেনি আজও।
জানা যায়, বিশাল জনপদের এ জেলার অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ কৃষি। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ও যমুনার চরাঞ্চলে
বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক উৎপাদন এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছে। এ জেলা ভুট্টা-মরিচ রসমঞ্জুরীর জন্য যেমন পরিচিত, তেমনি পরিচিত উন্নয়ন বঞ্চনা নিয়েও। পুরো জেলায় নেই কোনো কৃষি ভিত্তিক বা ভারী শিল্প কারখানা। এক সময়ের হাজারো শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহের উৎস রংপুর চিনিকল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। বিভিন্ন আন্দোলন, সভা, মানববন্ধন কিছুই খুলে দিতে পারেনি বহু বছরের এ শিল্প প্রতিষ্ঠানটি। শুধু মিলেছে আশ্বাসেরবাণী।
কৃষি উৎপাদন যতই হোক, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরাবস্থা গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় সংকট। গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা, ভাঙ্গাচুরা ব্রীজ আর নদীপথ নির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের চলাচল। সব মিলিয়ে প্রতিদিন যাতায়াতে ভোগান্তির যেন শেষ নেই। পণ্য পরিবহনে বাঁধা থাকায় ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এ জেলার কৃষকরা।
জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বালাসিঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত একটি সেতু বা টানেলের দাবি বহু দশকের পুরোনো। এই সংযোগ পথটি তৈরি হলে উন্নত হবে পণ্য পরিবহন, বাড়বে কর্মসংস্থান, একইসঙ্গে বদলে যাবে দু’পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান। সেটিও রয়ে গেছে আশ্বাস আর কাগজের প্রতিশ্রুতিতে। এখানে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি লঞ্চঘাট নির্মাণ করা হলেও নদীর নাব্যতা সংকটে তা নষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও পিছিয়ে উত্তরাঞ্চলের এ জেলা। একটি মেডিকেল কলেজ, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উঠে বারবার। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়নে নেননি কোনো উদ্যোগ। বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকায় দূরদূরান্তে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য। চরাঞ্চলে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ।
যুব সমাজের কর্মসংস্থান বাড়াতে গোবিন্দগঞ্জের কাটামোড় এলাকায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ঘোষণা এসেছিল কয়েক বছর আগে। সাইনবোর্ড ঝুলেছে, কিন্তু জমির মালিকানা নিয়ে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিরোধে ঝুলে আছে এর বাস্তবায়ন।
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া বেষ্টিত গাইবান্ধা প্রতিবছর তীব্র নদী ভাঙনের মুখে পড়ে। এক ঝড়ে ভেসে যায় ভিটে-বাড়ি, বদলে যায় স্থায়ী ঠিকানা। শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলে মাইলের পর মাইল হেঁটে পাড়ি দিতে হয় মৌলিক প্রয়োজনেও। জেলার অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও এই মানুষগুলোর ভাগ্যের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পায়ন, পর্যটনসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এ জনপদের উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়নি কেউ। দেশের সব জেলায় চলমান যে উন্নয়ন হয়েছে সেখানেও বারবার বৈষম্যর শিকার হয়েছেন এ জেলার মানুষ। নির্বাচন আসলে উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে জনপ্রতিনিধিরা ভোট নিয়ে আর খোঁজ রাখেনি তাদের।
শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানান, দীর্ঘ বঞ্চনার শিকার এ জেলার শিল্পায়ন, কৃষি, যোগাযোগ, পর্যটন সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ না হলে এ জেলার স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। গাইবান্ধার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও রয়েছে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা। ব্রহ্মপুত্রের তীর, তিস্তাপাড়, চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, গোবিন্দগঞ্জের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান সব মিলিয়ে এখানে গড়ে উঠতে পারে নদী কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প।
তারা আরও জানান, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই গাইবান্ধার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। কৃষির অপার সম্ভাবনা, চরাঞ্চলের মানুষের অবদান, আর পর্যটনের বিশাল ক্ষেত্র যদি সুপরিকল্পিত উদ্যোগে কাজে লাগানো যায়, তবে বদলে যেতে পারে এই জেলার সামগ্রিক চিত্র।



