এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল, অন্য হাতে ফুল: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তানহার বাবার হৃদয়স্পর্শী জবানবন্দি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল, অন্য হাতে ফুল—শেখ হাসিনার পতনের দিন ঠিক এভাবেই বিজয়ের মিছিল শেষে বাড়ি ফিরছিলেন মেহরুন নেছা তানহা। কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই ঘাতকের বুলেট কেড়ে নেয় ২২ বছর বয়সী এই কলেজছাত্রীর প্রাণ। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মেয়ের মৃত্যুর এই হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দেন তানহার বাবা মোশারফ হোসেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এদিন ছিল তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ। ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মোশারফ হোসেন। এই মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
যেভাবে গুলিবিদ্ধ হন তানহা রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তানহা পরিবারের সঙ্গে মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। জবানবন্দিতে মোশারফ হোসেন জানান, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর ভাইয়ের সঙ্গে বিজয় মিছিল নিয়ে গণভবনে গিয়েছিলেন তানহা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় বাবা তাদের ফোন করে এলাকার গোলাগুলির কথা জানান এবং পেছনের রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরতে বলেন। মোশারফ হোসেন বলেন, “ভিডিও কলে কথা বলার সময় মেয়ের এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল ও অপর হাতে একগুচ্ছ ফুল দেখতে পাই। তাকে দ্রুত বাসায় আসতে বলি।”
বাসার কাছাকাছি এসে তানহা তার ভাই আব্দুর রহমান তারিফকে ফোন করে দ্রুত ভেতরে আসতে বলেন। কিন্তু এর ঠিক এক মিনিট পরই মোশারফ হোসেনের স্ত্রীর ফোনে খবর আসে, তানহার শরীরে গুলি লেগেছে।
রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ফ্লোর খবর পেয়ে তানহার মামাতো ভাইয়ের বাবা ফারুককে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত বাসায় ছুটে যান মোশারফ। বাসায় গিয়ে দেখেন বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ তানহা ফ্লোরে পড়ে আছে এবং রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরের মেঝে। তখনও জীবিত থাকা মেয়েকে কোলে করে নিচে নামান বাবা, রক্তে ভিজে যায় তার গোটা শরীর।
দ্রুত মিরপুর আলোক হাসপাতালে নেওয়া হলেও চার-পাঁচ মিনিট পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লাশ গুমের ভয়ে তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ বাসায় নিয়ে আসেন এবং গোসল শেষে পূর্ব বাইশটেকি কবরস্থানে নিজের হাতে মেয়েকে দাফন করেন এই হতভাগ্য পিতা।
আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট জবানবন্দিতে মোশারফ জানান, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়মিত আন্দোলনে যেতেন। তিনি বারণ করতেন। কিন্তু ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় তাদের মামাতো ভাই আকরাম খান রাব্বী শহীদ হন। এরপর থেকে ছেলে-মেয়েকে আর ধরে রাখা যায়নি।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ঘটনার সময় তাদের বাসায় সাবলেট থাকা এক নারীও গুলিবিদ্ধ হন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান মোশারফ হোসেন। তানহা ও আকরাম হত্যার জন্য তিনি শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ওবায়দুল কাদের, মোহাম্মদ এ আরাফাত, ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, যুবলীগ নেতা মাইনুল হোসেন খান নিখিলসহ জড়িতদের দায়ী করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।



