চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এ সহকারী রেজিস্ট্রার বরখাস্ত,তদন্তে নেই দালিলিক প্রমাণ

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিনকে দালিলিক প্রমাণবিহীন তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্ত ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।বিষয়টি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নীতিমালা অনুসরণের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে “কোটি কোটি টাকার মালিক মশিবুর, সাহাব উদ্দিনের লাগামহীন দুর্নীতি” এবং “বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী রেজিস্ট্রার যখন কোটিপতি” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।প্রতিবেদনে সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে আত্মীয়স্বজনকে চাকরি দেওয়া,ছোট ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ,উপাচার্য দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে ৩ লাখ টাকার সিসি ক্যামেরা বিল ১৬ লাখ টাকা দেখানো, স্বাক্ষর জালিয়াতি,ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম,ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের নিয়োগ সংক্রান্ত ফোনালাপে সম্পৃক্ততা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মতো একাধিক অভিযোগ আনা হয়।
প্রকাশিত সংবাদের পর ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সাহাব উদ্দিন লিখিত প্রতিবাদলিপি দেন।সেখানে তিনি সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর দাবি করেন এবং বলেন,কোনো অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
দীর্ঘ প্রায় আট মাস পর,১৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিনকে নিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,গুরুতর আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সাধারণত একাধিক সদস্যের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে।সেখানে এক সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রিপোর্টে কোনো সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়নি; বরং প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্যকে ভিত্তি করেই পদাবনমন ও বদলির সুপারিশ করা হয়।
উল্লেখ্য, সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে এর আগে কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়নি এবং তিনি পূর্বে কোনো প্রশাসনিক শাস্তিও ভোগ করেননি।
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৫৬৪তম সভায় পূর্ববর্তী তদন্তের আলোকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং দ্বিতীয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।একই সঙ্গে সহকারী রেজিস্ট্রার থেকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে তার পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়।
সাহাব উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়,তদন্ত চলাকালীন সময়েও পদোন্নতি প্রক্রিয়া চালু রাখার নজির বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিকবার রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আলাওল হলের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় পদোন্নতি পাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
তাদের দাবি,তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই বরখাস্ত ও পদোন্নতি স্থগিত রাখা প্রশাসনিকভাবে অস্বাভাবিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত জবাব জমা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “২৬/০৯/২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৫৬৪তম সভার ১৮ (খ) নং সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ ব্যতিরেকে আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে,যা আমাকে সামাজিক ও মানসিকভাবে হেয় করেছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, তদন্ত রিপোর্টে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো যাচাইকৃত আর্থিক নথি, নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র বা সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
্
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, তদন্ত কমিটি দুই ধরনের হয়ে থাকে একটি ভাইস চ্যান্সেলর কর্তৃক গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি এবং অন্যটি সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত চূড়ান্ত তদন্ত কমিটি।প্রথম কমিটির রিপোর্টে যদি দোষের ইঙ্গিত পাওয়া যায়,তবে সিন্ডিকেট দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে থাকে।
্
তিনি বলেন, “কোনো তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিলে সেটিকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। তা হলে সেটি তদন্ত কমিটির জন্য প্রেস্টিজ কনসার্ন হয়ে দাঁড়ায়।”
২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে সংবাদভিত্তিক তদন্ত, এক সদস্যের কমিটি, দালিলিক প্রমাণের অনুপস্থিতি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই বরখাস্ত ও পদোন্নতি স্থগিত সব মিলিয়ে বিষয়টি নজিরবিহীন বলে মনে করছেন অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা।
বর্তমানে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে চূড়ান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কতটা ন্যায্য এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।



