অভিযানআইন-শৃঙ্খলা

সীতাকুণ্ডে নিরাপত্তাকর্মী ছালা উদ্দিন হত্যা পলাতক আসামি হৃদয় গ্রেপ্তার

মুহাম্মদ জুবাইর

র‌্যাব-৭ এর অভিযানে ছালা উদ্দিন হত্যার রহস্য উন্মোচনে অগ্রগতি,পাহাড়তলী থেকে হৃদয় আটক

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডে আলোচিত নিরাপত্তাকর্মী ছালা উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে র‌্যাব-৭। এজাহারনামীয় পলাতক আসামি মোঃ হৃদয়কে গ্রেফতারের মাধ্যমে মামলার তদন্তে নতুন গতি এসেছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে ইতোমধ্যে স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জনমনে স্বস্তি ফিরিয়েছে।

নিহত ছালা উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানার দক্ষিণ মাহমুদাবাদ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।তিনি বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত রাইজিং স্টিল শীপ ব্রেকিং লিমিটেড নামীয় একটি প্রতিষ্ঠানের ড্রেজারে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ড্রেজারে দায়িত্ব পালনকালে তৈল চুরিকে কেন্দ্র করে সহকর্মীদের সঙ্গে তার বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ওই দিন ভিকটিমের স্ত্রী খবর পান যে ড্রেজারে অবস্থানরত অবস্থায় জনৈক মোঃ রিফাত হোসেন এবং তার সহযোগীদের সঙ্গে ছালা উদ্দিনের বাকবিতণ্ডা হয়। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে বিরোধ চরমে পৌঁছালে রিফাত হোসেন ও তার সহযোগীরা ড্রেজারে অবস্থানরত তৈল ব্যবসায়ী মোঃ আশরাফ হোসেন কাজল এবং নিরাপত্তাকর্মী ছালা উদ্দিনের ওপর হামলা চালায়।

অভিযোগ অনুযায়ী,দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে ছালা উদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে একটি বোটে তুলে গভীর সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের দাবি,হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় এবং পরে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়।

৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ছালা উদ্দিন নিখোঁজ থাকার ঘটনায় তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা খবর পান যে কোয়ানিয়া খালে কাদায় আংশিকভাবে পোঁতা একটি মরদেহ পড়ে আছে। সেখানে গিয়ে তারা মরদেহটি ছালা উদ্দিনের বলে শনাক্ত করেন। পরে পুলিশকে খবর দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। ময়নাতদন্তে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও আঘাতজনিত চিহ্ন পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় ৭ জনকে এজাহারনামীয় এবং আরও ৮ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর ০৬, তারিখ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ধারা ৩০২ ২০১ ৩৪ দণ্ডবিধি ১৮৬০। মামলার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের গ্রেফতারে তৎপরতা শুরু করে।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাব ৭ গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া তদন্ত শুরু করে। প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান, সোর্স তথ্য এবং সম্ভাব্য অবস্থান বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা পলাতক আসামিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। একপর্যায়ে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে মামলার ৬ নম্বর এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি মোঃ হৃদয় চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী থানা এলাকায় অবস্থান করছে।
উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ আনুমানিক বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে র‌্যাব ৭ এর একটি আভিযানিক দল চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী থানাধীন ভিটাক বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে মোঃ হৃদয় ২৬ পিতা হারুন সাং মান্দারীটোলা থানা সীতাকুণ্ড জেলা চট্টগ্রামকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা গেছে।

গ্রেফতারকৃত আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তের স্বার্থে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে এবং অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় শীপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও ড্রেজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। তৈল চুরি ও অবৈধ বেচাকেনা নিয়ে প্রভাবশালী চক্রগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রায়শই সহিংসতায় রূপ নেয়। ছালা উদ্দিন হত্যাকাণ্ড সেই দ্বন্দ্বেরই ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।তারা দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি করা হবে না। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত না হয়।

ছালা উদ্দিনের পরিবার এখনো শোকাহত। পরিবারের এক সদস্য জানান, তিনি সৎভাবে চাকরি করতেন এবং কখনো কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। পরিবার দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা এবং ২০১ ধারায় অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়া ৩৪ ধারায় অভিন্ন অভিপ্রায়ে সংঘটিত অপরাধের দায় সকল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়। ফলে তদন্তে প্রত্যেকের ভূমিকা নিরূপণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

র‌্যাব ৭ এর সহকারী পুলিশ সুপার ও সহকারী পরিচালক মিডিয়া এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে র‌্যাব নিরলসভাবে কাজ করছে এবং গ্রেফতারকৃত আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং উপকূলীয় এলাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড দমনে বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে কর্মরত শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পাঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি, সিসিটিভি স্থাপন, শ্রমিকদের পরিচয় যাচাই এবং নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত বিচার, কার্যকর তদন্ত এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই এমন নৃশংস অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান তৎপরতা ও পলাতক আসামিদের গ্রেফতারই এখন স্থানীয়দের প্রধান প্রত্যাশা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button