বাংলাদেশে রাজনীতির নতুন দিগন্ত: ১১ দলের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ঘোষণা

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক | ঢাকা
বাংলাদেশের প্রচলিত সংঘাতময় রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তনের আভাস দিয়ে ১১টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ (Shadow Cabinet) গঠনের ঘোষণা এসেছে। অধ্যাপক এম এ বার্ণিকের এক বিশ্লেষণে এই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘নতুন দিগন্ত’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের সংঘর্ষ ও হানাহানির পরিবর্তে নীতিভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?
ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বিশেষ কাঠামো, যেখানে বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ নিয়োগ দেয়। তাদের মূল কাজ হলো:
- সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
- প্রতিটি সরকারি নীতির বিপরীতে বিকল্প ও উন্নত জনকল্যাণমূলক নীতি প্রস্তাব করা।
- সংসদে গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন ঘটানো।
- ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আগে থেকেই একটি দক্ষ ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রস্তুত রাখা।
যুক্তরাজ্যের মডেল ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
অধ্যাপক বার্ণিক তাঁর বিশ্লেষণে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্রের উদাহরণ টেনেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের সফল মডেলটি এখানে গুরুত্ব পেয়েছে, যেখানে বিরোধী দলকে ‘বিকল্প সরকার’ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশে এই মডেল বাস্তবায়িত হলে বিরোধী রাজনীতি কেবল ‘আন্দোলনমুখী’ না থেকে ‘সমাধানমুখী’ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনীতির সংস্কৃতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
১১ দলের এই নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর হলে দেশের রাজনীতিতে পাঁচটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে:
- সংঘাত হ্রাস: রাজপথের ভাঙচুর ও সংঘর্ষের বদলে রাজনীতি হবে তথ্য ও যুক্তিভিত্তিক।
- জবাবদিহিতা: সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে, কারণ তাদের ভুল ধরিয়ে দিতে ছায়া মন্ত্রীরা প্রস্তুত থাকবেন।
- শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর: নির্বাচনের পর হঠাৎ প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হবে না, কারণ বিরোধী দল আগে থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে।
- গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ির বদলে জাতীয় নীতি নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তবে এই নতুন ব্যবস্থা চালু করার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব, আদর্শিক ভিন্নতা এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিনের সংঘাতময় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তি ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতির চর্চা শুরু হলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাবে। ১১ দলের এই উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হয়ে থাকবে।



