প্রশাসন

বছরে তিন লাখ কোটি টাকার পণ্যের বড় অংশ খোলাবাজারে বিক্রি হয়

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বন্ড সুবিধা দিলেও ৮০ হাজার কোটি শুল্ককর ফাঁকি

স্টাফ রিপোর্টার: রপ্তানিকে উৎসাহ দিতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়। এই সুবিধার আওতায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শুল্ক ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল দিয়ে কেবল পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করতে হয়। অন্য উদ্দেশ্যে এসব কাঁচামাল ব্যবহার নিষিদ্ধ। বৈদেশিক মুদ্রার দেশে আনার স্বার্থে শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান শুল্ককর ফাঁকি দিতে কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র বলছে, বন্ড সুবিধায় প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ৫৫ লাখ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি হয়। এর গড় মূল্য ৩ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় এক বছরের রাজস্ব বাজেটের সমান। প্রতিবছর বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি হচ্ছে, যা দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব হতো।

সূত্রমতে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বন্ড ব্যবসায় অটোমেশনকে প্রাধান্য দিচ্ছে এনবিআর। সেজন্য ১ জানুয়ারি থেকে বন্ডের কার্যক্রম পুরোপুরি অনলাইনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া বন্ড প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় (আইএম-৭) কাঁচামাল আমদানির তথ্য বা ডেটা প্রকাশ করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মাশিয়াল বা শুল্ককর পরিশোধ করে কাঁচামাল আমদানির তথ্যও প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিদায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বন্ড সুবিধায় ১২৯ কোটি ৭৪ লাখ ৬০ হাজার ৯৫৮ কেজি বা ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি হয়েছে, যার মূল্য ২৮ হাজার ৪৮৫ কোটি ২৫ লাখ ৯৩ হাজার ১১৭ টাকা। প্রতিমাসে কাছাকাছি পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি হয়। বছরে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি মূল্যের বন্ড সুবিধার কাঁচামাল আমদানি হয় বলে কর্মকর্তারা জানান। এসব কাঁচামালের বেশিরভাগ কাপড়। এক তৃতীয়াংশ কোম্পানি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে স্টক লটের কাগজ দিয়ে ভুয়া রপ্তানি দেখায়। আইন ও বিধিমালার দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো অপব্যবহার করে বলে মনে করে এনবিআর। বেশিরভাগ বন্ড সুবিধার কোম্পানিকে এনবিআর বা বন্ড কমিশনারেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নিরীক্ষা করা হয়, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটির অপকর্ম বন্ড কমিশনারেট জানত না। এক শ্রেণির অসাধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস কর্মকর্তার সহায়তায় ঘুষ নিয়ে বন্দর থেকে বন্ডের কাপড় খালাস করে বিক্রি করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি সামনে আসার পর বন্ড কমিশনারেট মামলা করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে ভুয়া রপ্তানি দেখানোর চেষ্টা করছে।

শুধু রাফায়েত ফেব্রিক্স নয়, বি. ব্রাদার্স গার্মেন্টস কোং লিমিটেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান জাল এফওসি (ফ্রি অব কস্ট প্রত্যয়ন) ব্যবহার করে ৮ মাসে বন্ড সুবিধায় প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। এই কাপড় সোজা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, বিজিএমইএ অনুমোদিত সাতটি ইউপির (ইউটিলাইজেশন পারমিট) অধীনে ৫৫টি বিল অব এন্ট্রিতে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন কাপড়ও প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দিয়েছে কোম্পানিটি।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকছে যে কেবল পাইকারি নয়, ডোর টু ডোর সার্ভিসের মাধ্যমে এক কেজি করে বন্ড সুবিধার কাপড় বিক্রি করা হচ্ছে। কেএলডি অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের নাম সর্বস্ব পোশাক কারখানা বছরের পর বছর বন্ড লাইসেন্স জালিয়াতি করে আসছে। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কাপড়ের পাশাপাশি বন্ড সুবিধায় আনা এক্সেসরিজের কাঁচামালও খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে দেদার। জংশিন টেক্সটাইল (বিডি) লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার বিপুল পরিমাণ পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার শিট আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে।
কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে শুল্ককর পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে বিদেশে চলে যায়।

এই বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় সাপ্তাহিক “অপরাধ বিচিত্রাকে” বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে বন্ড ব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইন করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এখনও দুর্বলতা রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে তা কেটে যাবে। অপব্যবহার বিষয়ে তিনি বলেন, ভালো ব্যবসায়ীরা যতদিন সচেতন না হবেন, ততদিন অপব্যবহার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হবে না। কিউ-আর ফ্যাশনস লিমিটেডের নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পাঁচ বছরে বন্ড সুবিধায় প্রায় ২১৯ কোটি টাকার কাপড় আমদানি করেছে, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা। শুল্ককর পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মালিক যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন। অবন্তী কালার টেক্স লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে, যাতে শুল্ককর প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। এর মালিকও বিদেশে পালিয়ে গেছেন। শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে নয়, অনেক প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করেও টাকা দেশে আনেনি। বেক্সিমকো গ্রুপের ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করলেও দেশে আনেনি প্রায় ৬৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

বন্ড সুবিধার পণ্য কীভাবে আমদানি হয়ে খোলাবাজারে চলে যায়, তা নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) সম্প্রতি এনবিআরের কাছে বিশেষ প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে দেখা যায়, বন্ড সুবিধার কাঁচামাল চট্টগ্রামের টেরিবাজারে জাহাজ থেকে খালাসের বন্ডেড ওয়্যারহাউজের বদলে সরাসরি চলে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি মার্কেটে। গোয়েন্দাদের অনুসন্ধান বলছে, বন্ড সুবিধার কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রাকে করে নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে খালাস হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা ঢাকার চিটাগাং রোডের কাছে বিভিন্ন বাড়িকে অস্থায়ী গোদাম বানায়। সেখানে এনে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল মজুদ করা হয়। সুবিধামতো সময়ে সেখান থেকে রাজধানীর ইসলামপুর, সদরঘাটের বিভিন্ন মার্কেটে পাচার করা হয়। দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিক এই চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত।

কিছু অসাধু গার্মেন্টস মালিক নামমাত্র ২০ থকে ২৫টি মেশিন বসিয়ে ভুয়া উৎপাদন দেখিয়ে পোশাক ব্যবসার নামে বন্ড সুবিধার আওতায় কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করছেন। এছাড়াও গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিকারকদের একটি অংশ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাঁচামালের প্রাপ্যতা দেখিয়ে আমদানি করা অতিরিক্ত পণ্য অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করছে। বিশেষ একটি কমিশনের বিনিময়ে অন্যের বন্ড লাইসেন্স ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় গার্মেন্টেসের কাঁচামাল আমদানি করে চোরাকারবারি চালিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান নানা কৌশলে বন্ড সুবিধা আদায় করছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়ার পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী, যারা গার্মেন্টের সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন কেবল বন্ডের অপকর্ম করার জন্য। বন্ডের অপব্যবহার কারা করেন, কাস্টমসের লোকজন জানেন। যারা অপকর্ম করেন, তাদের পণ্য কখনো কাস্টমস আটকায় না। কিন্তু কাস্টমস অন্য ব্যবসায়ীদের হয়রানি করেন। কাস্টমসের লোকজনের স্বেচ্ছারিতার কারণে এই হয়রানি ও ক্ষতি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি যদি জানি বন্ডের কাপড় এনে বিক্রি করে দেব, আমি কিন্তু আগে থেকেই কোন গ্রুপে আমার কাঁচামাল আসবে, সেই গ্রুপে কে কে আছেন, সবাইকে টাকা দিয়ে ফিট করে রাখব। যাতে আমার মাল আসলে বিলম্ব না করে, না আটকায়।

হাতেম আরও বলেন, যারা বন্ডের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের দুই-একজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এনবিআর কেন দিচ্ছে না? এনবিআর দুই, একজনকে ধরে জনসম্মুখে, পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে তাকে হেনস্তা করা হোক। বন্ডের এই কিছু সংখ্যক চোরের দায় আমরা নিতে চাচ্ছি না। আর বন্ডের কাপড় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত এই অপবাদ আমরা শুনতে চাই না। আমরা চাই, এনবিআর এদের যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করুক। যাতে অন্যরা সাবধান হয়ে যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button