দুর্নীতি

বায়োফার্মায় হাজার কোটি টাকার লুটপাট: আদালতের নির্দেশের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে লকিয়তুল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

দেশের ওষুধ খাতের এক সময়ের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বায়োফার্মা লিমিটেড-কে ঘিরে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভ্যন্তরীণ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রধান অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ডা. লকিয়তুল্লাহ এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর রহস্যজনক ধীরগতিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা।

উচ্চ আদালতের আদেশ ও তদন্তের বর্তমান অবস্থা

গত বছর সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ বায়োফার্মার দুর্নীতি অনুসন্ধানে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বহাল রাখেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত চালিয়ে যেতে কোনো আইনি বাধা নেই।

তবে আদালতের এই কঠোর অবস্থানের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, তদন্ত প্রক্রিয়া ধামাচাপা দিতে বায়োফার্মার একটি প্রভাবশালী চক্র কোটি কোটি টাকার ‘লবিং’ বা বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ৫০০ কোটির অনিয়ম

কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পাঁচটি তদন্ত কমিটির করা ৪০৫ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে:

  • অর্থ পাচার: ‘বায়োফার্মা ফাউন্ডেশন’ ও ‘গোল্ড ট্রেডিং কোম্পানি’র মতো কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • লভ্যাংশ ও এজিএম জালিয়াতি: দীর্ঘ ২২ বছর ধরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি এবং ১৫ বছর ধরে কোনো বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) অনুষ্ঠিত হয়নি।
  • রাজস্ব ফাঁকি: বিক্রির প্রকৃত তথ্য গোপন করে সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতার নেপথ্যে ডা. লকিয়তুল্লাহ

১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটি ১৯৯৯ সালে নতুন মালিকানায় আসার পর থেকেই অনিয়মের জাল বিস্তৃত হয়। বর্তমানে নাছিমা বেগম ঝুমুর চেয়ারম্যান এবং ডা. মো. মিজানুর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে থাকলেও, প্রকৃত ক্ষমতা ডা. লকিয়তুল্লাহর হাতে বলেই অভিযোগ শেয়ারহোল্ডারদের। প্রতিষ্ঠানের সব বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং বিনিয়োগ তার একক ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হতো বলে জানা গেছে।

দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হত্যা মামলা

বায়োফার্মার সাবেক চেয়ারম্যান ডা. সওকাত আলী লস্করের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা মামলা এই ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিবারের অভিযোগ, ডা. সওকাত যখন দুর্নীতির ফাইলগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু করেন, তখন থেকেই তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। পরবর্তীতে তার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ডা. লকিয়তুল্লাহকে প্রধান আসামি এবং ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আনোয়ারুল আজিমসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

অনিশ্চয়তায় কর্মচারী ও শেয়ারহোল্ডাররা

তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এক সময়ের প্রভাবশালী এই কোম্পানির উৎপাদন ও সুনাম আজ তলানিতে। সাধারণ কর্মচারীরা চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন, আর বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত।

দুদক সূত্র জানায়, আর্থিক নথি ও ব্যাংক লেনদেন যাচাইয়ের কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়বে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব মেলেনি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর তদন্তে এমন স্থবিরতা বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বায়োফার্মাকে খাদের কিনারা থেকে রক্ষা করতে এবং হাজার কোটি টাকার লুটপাটের বিচার নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত ডা. লকিয়তুল্লাহসহ অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button