হালিশহরে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণ:মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচ একই পরিবারের ওপর নেমে এলো মৃত্যুর ছায়া

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরে একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।এর ফলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে।মঙ্গলবার ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৪৬ বছর বয়সী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও ৩৫ বছর বয়সী আশুরা আক্তার পাখি।হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, তাদের শরীরের প্রায় শতভাগ দগ্ধ হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এই ঘটনার আগে মঙ্গলবার দুপুরে ৪০ বছর বয়সী সামির আহমেদ সুমন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।আর সোমবার প্রথম মৃত্যু হয় নুরজাহান আক্তার রানী ও তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে শাওনের।টানা দুই দিনে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়ে পাঁচে পৌঁছেছে।চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেঁচে থাকা চারজনের অবস্থাও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং তাদের আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনাটি ঘটে সোমবার ভোরে হালিশহর এইচ ব্লকের এসি মসজিদ সংলগ্ন ছয়তলা ভবন ‘হালিমা মঞ্জিল’ এর তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস জমে ছিল।ভোরের দিকে আগুনের সংস্পর্শে আসতেই জমে থাকা গ্যাস বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে পুরো ফ্ল্যাট কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেশীরা জানান,বিকট শব্দে আশপাশের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।কেউ কেউ প্রথমে ভূমিকম্প ভেবেছিলেন। পরে ধোঁয়া ও আগুন দেখে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়।স্থানীয়রা ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দগ্ধদের উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গুরুতর আহতদের ঢাকায় পাঠানো হয়।
নিহত ও আহতরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন মো. সাখাওয়াত হোসেন, তার স্ত্রী নুরজাহান আক্তার রানী, তাদের ছেলে শাওন, সাখাওয়াতের ছোট ভাই সামির আহমেদ সুমন এবং সুমনের স্ত্রী আশুরা আক্তার পাখি।দগ্ধদের মধ্যে রয়েছে সাখাওয়াতের ১০ বছর বয়সী মেয়ে উম্মে আয়মান স্নিগ্ধা, সুমনের দুই শিশু সন্তান চার বছরের আয়েশা ও ছয় বছরের ফারহান আহমেদ আনাস এবং পরিবারের আরেক সদস্য শিপন হোসেন। তাদের শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেছে এবং চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জীবন রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের ভাষ্য, দগ্ধদের অধিকাংশের শ্বাসনালীও পুড়ে গেছে। এতে করে সংক্রমণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আইসিইউতে উন্নত জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে,রান্নাঘরের গ্যাস লাইনে লিকেজ ছিল এবং জানালা-দরজা বন্ধ থাকায় গ্যাস জমে বিস্ফোরণের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাস লাইন ও সিলিন্ডার ব্যবহারে অসতর্কতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে,ভবনটির গ্যাস সংযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে বলেও জানা গেছে।
চট্টগ্রামের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। একসঙ্গে একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যু এবং বাকিদের জীবন-মৃত্যুর লড়াই স্থানীয়দের নাড়া দিয়েছে গভীরভাবে।প্রতিবেশীরা বলছেন, পরিবারটি শান্ত ও ভদ্র ছিল। হঠাৎ এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসাবাড়িতে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।গ্যাসের গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গে চুলা বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করা, দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত গ্যাস লাইনের লিকেজ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।সামান্য অসতর্কতাই ডেকে আনতে পারে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
এই মর্মান্তিক বিস্ফোরণ আবারও মনে করিয়ে দিল,নগর জীবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা যে কোনো সময় বড় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পারে। এখন পুরো দেশ তাকিয়ে আছে আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা চারজনের দিকে,তাদের সুস্থতার প্রার্থনায়।



