দোকান দখল করে বিএনপির অফিসের সাইনবোর্ড অসহায় নারীর অভিযোগ স্থানীয় এমপি ও ওসিকে জানিয়েও মেলেনি প্রতিকার

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের পটিয়ায় এক অসহায় নারীর দোকান জবরদখল করে সেখানে বিএনপির ইউনিয়ন কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ এক মাস ধরে এই দখল চলছে, অথচ থানা পুলিশ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।

পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া ইউনিয়নের মৌলভীহাট এলাকায় ঘটেছে এই ঘটনা। ভুক্তভোগী রাজিয়া হোসেন (৫৮) নামের এক নারী দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রতিকারের জন্য হাহাকার করছেন।

অভিযোগকারীর বক্তব্য: ‘এক মাস ধরে দখল, বিচার পাচ্ছি না’
ভুক্তভোগী রাজিয়া হোসেন (৫৮) প্রতিবেদক কে জানান, তার স্বামী মোতাহের হোসেন দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোক ও হার্টের জটিল রোগে ভুগছেন। তাদের ছেলেরা বিদেশে থাকায় অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে তিনি খুবই কষ্টে আছেন। পটিয়ার পেরলা এলাকায় তার স্বামীর পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একটি দোকান ছিল, যা দিয়ে সংসার চালাতেন তারা।
রাজিয়া হোসেনের অভিযোগ, করোনা পরবর্তী সময়ে দোকানটির ভাড়াটিয়া মারা গেলে এবং স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় দোকানটি কিছুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরে তিনি দোকানটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য স্থানীয় সেকান্দর নামের এক ঠিকাদারকে এক লাখ সত্তর হাজার টাকা দিয়ে সংস্কার কাজ করান।
“সংস্কার শেষে দোকানটি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও সেকান্দর বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। গত এক মাস ধরে তিনি আমার দোকানটি জবরদখল করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, সেখানে পটিয়া উপজেলাধীন ‘বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়’ লেখা একটি সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে,” – বলেন রাজিয়া হোসেন।
তিনি আরও জানান, থানা পুলিশ এবং পটিয়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এনামুল হক এনামকে ভোটের আগে বিষয়টি জানানোর পরও কোনো সুরাহা হয়নি। এরমধ্যে কিছুতেই সংসদ সদস্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছেন না।
অভিযোগ সুত্র বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্য মাইকে ঘোষণা দিয়েছিলেন কারো জমি-দোকান দখল করে চাঁদাবাজি করা বিএনপির কাজ নয়। কিন্তু তারপরও আমার দোকান দখলমুক্ত হয়নি। আমি একজন অসহায় নারী, আমার স্বামী অসুস্থ। আমরা কোথায় গিয়ে বিচার পাবো?” – ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই নারী।
অভিযুক্তের বক্তব্য: ‘আজ রাতেই সাইনবোর্ড সরিয়ে নেব’
অভিযুক্ত মোঃ সেকান্দর (৪৫) এর কাছে এ বিষয়টি জানতে চাইলে সাইনবোর্ড টাঙানোর কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “উনি আমাকে দোকানে কাজ করতে দিয়েছিলেন। আমি কিভাবে কাজ করেছি সব কাগজ ওসির কাছে জমা দিয়েছি। দোকান তৈরি হওয়ার পর উনাকে বিএনপির কার্যালয় করার কথাও জানানো হয়েছিলো।”
তবে দোকানে কেন বিএনপির ইউনিয়ন কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙানো হলো- জানতে চাইলে সেকান্দর বলেন, “এ বিষয়ে পুলিশের সাথেও কথা হয়েছে। গতকাল নামানোর কথা ছিল, সরানো হয়নি। বিদ্যুৎ লাইনের সমস্যার কারণে আজ রাতেই সরিয়ে নেবো। একটা সমাধান হবে।”
বিএনপি নেতাদের অবস্থান: ‘এটি কোনো ইউনিয়ন কার্যালয় নয়’
এ বিষয়ে পটিয়া ৯নং (ক) বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মন্নান স্পষ্টভাবে বলেন, “এটি কোন ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয় নয়। এডভোকেট ফোরকানুল ইসলাম ফেসবুকে ছবি দিয়ে বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ের উদ্বোধনের কথা লেখার পর আমি তাঁর কাছে জানতে চাই, এটি কে নিয়েছে, কার দোকান। তিনি তখন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। কারণ তিনি নিজেও বিএনপির কোন সদস্য নন।”
তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী নারী ভোটের আগে এমপি সাহেবের কাছেও অভিযোগ করেছিলেন। এমপি সাহেব ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নিতে থানা ওসিকেও নির্দেশ দিয়েছেন বলে তিনি জেনেছেন। তবে এখনো যে ওই নারী কেন সমাধান পাননি তার খোঁজ খবরের আশ্বাস দেন তিনি।
অন্যদিকে, একই দোকানের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে উদ্বোধনের কথা লেখা এডভোকেট ফোরকানুল ইসলাম বলেন, “ওই নারী থানায় অভিযোগ দিয়েছে শুনেছি। তবে কার দোকান কে নিয়েছে আমি জানি না। শুধুমাত্র বিএনপির কার্যালয় দেখে একটা ছবি তুলেছিলাম আর ফেসবুকে দিয়েছিলাম। এর বাইরে আমি কিছুই অবগত না।”
পুলিশের অবস্থান: ‘তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ জিয়াউল হক জানান, “এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। ভুক্তভোগীকে থানায় ডাকা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রদীপ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আশা করি শিগগিরই সমাধান হবে। দুই পক্ষের কিছু লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ও এখানে উঠে এসেছে। সবকিছু বিবেচনায় রেখে ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংসদ সদস্যের অবস্থান: মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তার এক শুভাকাঙ্ক্ষী নেতা জানান, সংসদ সদস্য বর্তমানে একটি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা
ঘটনাটি ঘটেছে গত এক মাস ধরে। ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও কেন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার ছিলো। জমি-জমি সংক্রান্ত বিরোধ হলেও জোরপূর্বক দখল এবং হুমকি দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশের উচিত দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকৃত মালিকের দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা।
দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার
রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে কারও সম্পত্তি দখল করে, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। বিএনপির স্থানীয় নেতারা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এটি তাদের দলীয় কোনো কার্যালয় নয়। এখন দলের উর্ধ্বতন নেতৃত্বের উচিত এই ঘটনার সঙ্গে দলের কেউ যদি জড়িত থাকে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা দেওয়া।
অপরদিকে, এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব হলো সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা শোনা এবং তা নিরসনে ভূমিকা রাখা। নির্বাচনের আগে মাইকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এখনই সময়। প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তাকে বিষয়টি দেখার দাবি রাখে বড়লিয়ার লোকজন।
ভুক্তভোগীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা
৫৮ বছর বয়সী এক নারী, স্বামী অসুস্থ, ছেলেরা প্রবাসে। এমন একটি পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই দোকান। এক মাস ধরে দোকান বন্ধ থাকায় তার আর্থিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের উচিত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা।
স্থানীয় এলাকার সচেতন নাগরিক, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের মতামত হলো, কোনো নারীর সম্পত্তি দলীয় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দখল করার ঘটনা এলাকার মর্যাদার জন্য কলঙ্কজনক। এলাকাবাসীর উচিত প্রশাসনকে চাপ দেওয়া যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
একজন অসহায় নারীর দীর্ঘ এক মাসের হাহাকার আজও থামেনি। প্রশাসনের আশ্বাস, বিএনপি নেতাদের অস্বীকৃতি এবং অভিযুক্তের ‘সাইনবোর্ড সরানোর’ প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি।
রাজিয়া হোসেনের মতো সাধারণ মানুষের জন্য আইনি প্রতিকার যত দ্রুত ও সহজলভ্য হবে, ততই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে বলে এলাকার লোকজনের বিশ্বাস।



