গাইবান্ধার মানুষের ঈদযাত্রা এক অনিশ্চয়তার নাম

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঈদ মানেই ঘরে ফেরার আনন্দ। সারা বছর শহরের ব্যস্ততা, কারখানা, গার্মেন্টস, নির্মাণ শ্রম আর ছোট ছোট চাকরির ক্লান্তি ভুলে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দু’দিনের হাসি-আনন্দে ডুবে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই বারবার থমকে যায় যানবাহনের আসন সংকটে। উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধার মানুষের জন্য ঈদযাত্রা যেন প্রতি বছরই এক অনিশ্চয়তার নাম।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের (রাজশাহী) জেনারেল ম্যানেজার ফরিদ আহমেদ বলেন, এই রুটে যাত্রী চাপ অনেক বেশি। কিন্তু কোচ ও মিটারগেজ ইঞ্জিন সংকটের কারণে আপাতত নতুন বা বিশেষ ট্রেন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সক্ষমতা বাড়লে ভবিষ্যতে নতুন ট্রেন দেয়া হবে।
অন্যদিকে, গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম জানিয়েছেন, নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রেন বরাদ্দের বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে নিয়মিত আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে ৩টি- লালমনি এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস ও বুড়িমারী এক্সপ্রেস। অথচ জেলার বামনডাঙ্গা, গাইবান্ধা ও বোনারপাড়া এই ৩টি স্টেশনের জন্য মোট বরাদ্দ আসন মাত্র ৪১২টি। জেলার ৭ উপজেলা ও ৪টি পৌর শহর মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন। ঈদের সময় সেই চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে সিট পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, ২০০৪ সালের ৭ মার্চ চালু হওয়া লালমনি এক্সপ্রেসে ১৪টি বগিতে মোট ৫৯৩টি আসন থাকলেও গাইবান্ধার জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৬৬টি। ২০১১ সালের ২১ আগস্ট চালু হওয়া রংপুর এক্সপ্রেসে মোট ৮৪০ আসনের বিপরীতে বরাদ্দ ১৪১টি আর ২০২৪ সালের ১২ মার্চ চালু হওয়া বুড়িমারী এক্সপ্রেসে ৬৫৩ আসনের মধ্যে গাইবান্ধা ও বোনারপাড়া স্টেশনের জন্য বরাদ্দ ১০৫টি। বুড়িমারী এক্সপ্রেস বামনডাঙ্গা স্টেশনে ৩ মিনিটের জন্য দাঁড়ালেও সেখানে কোনো আসন বরাদ্দ নেই- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে ওই এলাকার যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন।
গাইবান্ধা রেলস্টেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, অনলাইনে শতভাগ টিকেট বিক্রির ফলে অন্য জেলার যাত্রীরাও এখানকার কোটা থেকে টিকেট কেটে নেন। এতে স্থানীয়দের সংকট আরও বাড়ে। তার মতে, এ রুটের জন্য যাত্রীসংখ্যা বিবেচনায় অন্তত ৪টি আন্তঃনগর ট্রেন প্রয়োজন।
জেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি বাস ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করে। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ট্রেনই নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভরসা। গাইবান্ধার কলেজ পাড়ার বাসিন্দা ঢাকায় কর্মরত যাত্রী আহাদ আহমেদ মুঠোফোনে জানান, সারা বছর কষ্ট করে কাজ করি। ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি যাব এই আশা। কিন্তু সিট পাই না। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই বাস বা অন্য গাড়িতে যেতে হয়।
নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগ গাইবান্ধার সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই রেলসেবায় গাইবান্ধার মানুষ বৈষম্যের শিকার। পর্যাপ্ত ট্রেন না থাকায় ঈদের সময় বহু মানুষ ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানে বাড়ি ফেরেন। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে প্রতি বছর। তার কথায়, ঈদের আনন্দ অনেক পরিবারের জন্য বিষাদে পরিণত হয়।
মুঠোফোনে কথা হয় গাইবান্ধা পৌর শহরের বাসিন্দা ঢাকায় কর্মরত রাসেল আহমেদের সঙ্গে। ঢাকার একটি তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানায় কাজ করেন তিনি। আলাপকালে তিনি বলেন, টিকেট না পেলে দাঁড়িয়ে যাব। আর তা না হলে ট্রাকে উঠব। ঈদে ঘরে তো ফিরতেই হবে। কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, আবার অনিশ্চয়তার ছাপ।
সম্প্রতি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন রুটে ৫ জোড়া বিশেষ আন্তঃনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও ঢাকা-সান্তাহার হয়ে বগুড়া-গাইবান্ধা-রংপুর-লালমনিরহাট রুট সেই তালিকায় নেই। এতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যাত্রী চাপ ও বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রুট কেন উপেক্ষিত?
রেলসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশেষ ট্রেন না দিলেও ঈদ উপলক্ষে ৩টি আন্তঃনগর ট্রেনে দুটি করে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও যাত্রীরা বলছেন, বাড়তি ২ বগি সামগ্রিক সংকটের তুলনায় অপ্রতুল।
গাইবান্ধার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, দেড় যুগেও আসন বরাদ্দ বাড়েনি। জেলার অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিপুল শ্রমজীবী মানুষের ঢাকামুখী স্রোত এবং ঈদে বাড়ি ফেরার চাপ বিবেচনায় এ রুটে অন্তত আরও দু’টি ট্রেন জরুরি।
ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পরিবারের পুনর্মিলনের সময়। কিন্তু আসন সংকট, টিকেটের অপ্রতুলতা, কালোবাজারি ও শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে গাইবান্ধার মানুষের ঈদযাত্রা রয়ে গেছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। ঈদযাত্রায় শামিল হতে চাওয়া যাত্রীদের এখন একটাই চাওয়া- একটি নিশ্চিত টিকেট, একটি নিরাপদ আসন আর সময়মতো বাড়ি পৌঁছানোর নিশ্চয়তা। তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়, শুধু নিরাপদে ঘরে ফেরার সুযোগ।
ঈদের চাঁদ উঠলেই তাই গাইবান্ধাবাসীর মনে প্রশ্ন জাগে, এবার কি মিলবে সেই কাঙ্খিত বিশেষ ট্রেন, নাকি আবারও আসন সংকটের ভিড়ে হারিয়ে যাবে ঘরে ফেরার আনন্দ?



