প্রশাসন

প্রশাসনে জবাবদিহিতা ছাড়া উচ্চপদস্থদের আকস্মিক ভিজিট অর্থহীন

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

সরকারি অফিসগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আকস্মিক ভিজিটকে ‘অর্থহীন প্রয়াস’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট বিশ্লেষক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের একটি ভূমি অফিসে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের আকস্মিক পরিদর্শনের পর এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে তিনি এই মত প্রকাশ করেন। তার মতে, ভয় থেকে নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

ঘটনার প্রতীকী তাৎপর্য ও সাময়িক সতর্কতা

গত ৪ মার্চ ২০২৬, সকাল ৯টায় নারায়ণগঞ্জের একটি ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে যান ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সেখানে গিয়ে তিনি অফিস তালাবদ্ধ দেখতে পান। এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পিয়ন এসে দরজা খোলেন এবং এরপর ধীরে ধীরে অন্য কর্মচারীরা উপস্থিত হন।

অধ্যাপক বার্ণিক এই দৃশ্যকে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার একটি ‘প্রতীকী চিত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, মন্ত্রীর এ ধরনের উপস্থিতি সাময়িক সতর্কবার্তা হতে পারে, তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ভিজিটের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাময়িকভাবে ‘ভয়-ভিত্তিক শৃঙ্খলা’ দেখা গেলেও, কিছুদিন পর পুরনো অভ্যাসই ফিরে আসে। টেকসই শৃঙ্খলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির কোনো বিকল্প নেই।

গোয়েন্দা নজরদারি ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (ডিজিএফআই, এনএসআই, সিআইডি ইত্যাদি) সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন অধ্যাপক বার্ণিক। তিনি বলেন, অফিস উপস্থিতি, জনসেবার গতি ও দালাল চক্রের মতো বিষয়গুলোর ওপর নিয়মিত ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছানো উচিত। অধস্তনরা যখন জানবেন যে তাদের কাজের নীরব মূল্যায়ন হচ্ছে, তখনই চেইন অব কমান্ড কার্যকর হবে।

পাশাপাশি, গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়েও তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মতৎপরতা এবং সময়ানুবর্তিতা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যা ইতিবাচক। তবে প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিকতার মূল কাজ হওয়া উচিত তৃণমূলের বাস্তবতা—যেমন ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা শিক্ষা অফিসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরা। গণমাধ্যমকে ক্ষমতার দৃশ্য প্রচারের পাশাপাশি নাগরিককেন্দ্রিক অনুসন্ধানী ভূমিকা পালন করতে হবে।

শৃঙ্খলা ফেরাতে ৩ স্তম্ভের সমন্বয় ও প্রস্তাবনা

প্রশাসনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের সমন্বিত শক্তির কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক বার্ণিক পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন:

  • বায়োমেট্রিক উপস্থিতি: সকল সরকারি অফিসে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করে তা কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত করা।
  • গোপন মূল্যায়ন: গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাসিক গোপন মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রস্তুত করা।
  • কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক পদোন্নতি: প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে কেবল কাজের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি নিশ্চিত করা।
  • সাংবাদিকদের সুরক্ষা: অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
  • দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রকাশ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।

পরিশেষে অধ্যাপক বার্ণিক বলেন, “নারায়ণগঞ্জের ওই ভূমি অফিসের তালাবদ্ধ দরজা কেবল অব্যবস্থাপনার গল্প নয়, এটি চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতার প্রতীক। রাষ্ট্রের শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন মাঠপর্যায়ের প্রতিটি অফিস সময়মতো খুলবে—ভয় থেকে নয়, দায়িত্ববোধ থেকে।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button