মব কালচার নয় প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধানের মাধ্যমেই সমাধান: চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব আয়োজিত ইফতার, দোয়া মাহফিল ও সুধি সমাবেশে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বিগত সরকার প্রেস ক্লাবকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছিল। ফলে জনগণের সার্বজনীন প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ও ঘৃণিত হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, এই প্রেস ক্লাবের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করতে হলে সাংবাদিকদের ঐকমত্য এবং সুনির্দিষ্ট গঠনতন্ত্রের আলোকে এগোতে হবে।
আজ বুধবার ৪ মার্চ বিকেলে চট্টগ্রাম ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইফতার মাহফিলটি ছিল সাংবাদিক,রাজনীতিক,সুধীজন ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এক মিলনমেলা।বক্তব্যের শুরুতেই তিনি রমজানের তাৎপর্য তুলে ধরে আত্মশুদ্ধি, সহনশীলতা ও ঐক্যের বার্তা দেন।পরে তিনি প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন,প্রেস ক্লাব পরিচালিত হবে তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী।এই গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের এখতিয়ার শুধুমাত্র সদস্যদের।বাইরের কোনো শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার বল প্রয়োগ করে এই কাজ করা উচিত নয়।তিনি সরকারকে জাতির অভিভাবক এবং নির্বাচিত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,কোনো প্রতিষ্ঠানের সমস্যা মব কালচার দিয়ে নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধানের মধ্য দিয়ে সমাধান করতে হবে।আইন ও নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই সভ্য সমাজের পরিচয়।
সভায় তিনি আরও বলেন,শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই প্রেস ক্লাব ভবনের উদ্বোধন করেছিলেন।পরবর্তীতে একটি অস্থির সময়কালে তাঁর নামফলক উপড়ে ফেলা হয়।ধ্বংসস্তূপ থেকে সেই নামফলক উদ্ধার করে সংরক্ষণ করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।মন্ত্রী বলেন,আমার পরামর্শ হলো এই নামফলক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হোক।যারা এতে এগিয়ে আসবেন তারাই প্রমাণ করবেন যে তাঁরা প্রেস ক্লাবকে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান এবং ইতিহাসকে সম্মান করেন।
তিনি বিগত সরকারকে ফ্যাসিবাদী আখ্যা দিয়ে বলেন, দীর্ঘ সময় অন্যায় ও একদলীয় মনোভাব চর্চা করার কারণে গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে। খুন,গুম এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের কারণে তারা জনগণের সমর্থন ও রাজনৈতিক ভিত্তি হারিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান যদি দলীয়করণ হয় তাহলে সেটিই ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
তিনি আরো বলেন,বর্তমান সরকার কোনো অপরাধকে ছাড় দেবে না।সব অপরাধকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং কোনো অপরাধকে তামাদি হতে দেওয়া হবে না।তবে বিচার প্রক্রিয়া অবশ্যই আইনগত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।কোনো আইনবহির্ভূত পন্থা কিংবা প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।তিনি বলেন,গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে সংবাদমাধ্যমকে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সংবাদকর্মীরা সমাজের দর্পণ।এই দর্পণে রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন,প্রেস ক্লাব কেবল একটি ভবন নয় এটি জনগণের সংসদ।এখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, গণতান্ত্রিক চর্চা হবে এবং দেশের মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হবে।শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু ও প্রবর্তন করেছিলেন।
সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচির সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ ও যুগ্ম সম্পাদক মিয়া মো. আরিফের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান,চট্টগ্রাম ১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী,চট্টগ্রাম ১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান,দৈনিক আজাদী পত্রিকার সম্পাদক এম এ মালেক,বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী,জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ,প্রেস ক্লাবের উপদেষ্টা মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত ও ওসমান গণি মনসুর,সিএমইউজের সভাপতি মো. শাহেনওয়াজ, মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন,নগর বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াসিন চৌধুরী লিটন,প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ সভাপতি মুস্তফা নঈম, সিএমইউজের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান,নগর নিউজের সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ও রিদুয়ান সিদ্দিকী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার সম্পাদক ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী,দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের সম্পাদক রুশো মাহমুদ,দৈনিক কর্ণফুলীর সম্পাদক আফসার উদ্দিন চৌধুরী, প্রেস ক্লাবের উপদেষ্টা শামসুল হক হায়দরী,কাজী আবুল মনসুর,কার্যকরী সদস্য রফিকুল ইসলাম সেলিম,সাইফুল ইসলাম শিল্পী,আরিচ আহমেদ শাহসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
এছাড়া ক্লাবের সহসভাপতি ডেইজি মওদুদ,অর্থ সম্পাদক আবুল হাসনাত, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রূপম চক্রবর্তী, ক্রীড়া সম্পাদক রুবেল খান, গ্রন্থাগার সম্পাদক প্রধান মো. শহীদুল ইসলাম, সমাজসেবা ও আপ্যায়ন সম্পাদক হাসান মুকুল এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ফারুক আবদুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।দেশ, জাতি ও গণমাধ্যমের উন্নয়ন কামনায় মোনাজাত করা হয়।ইফতারের আগে ও পরে সাংবাদিকদের মধ্যে মতবিনিময় হয়।বর্তমান সময়ের গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ,ডিজিটাল রূপান্তর, ভুয়া খবর প্রতিরোধ এবং পেশাগত নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানের আগে তথ্যমন্ত্রী প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং সরকারের তথ্যনীতি,গণমাধ্যমবান্ধব উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা তুলে ধরেন।তিনি বলেন, সরকার একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী গণমাধ্যম চায়। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। ভ্রান্ত তথ্য, অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি রোধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন,সাংবাদিক সমাজের ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাজন ও দলীয় প্রভাব সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।প্রেস ক্লাবের মতো প্রতিষ্ঠানকে ঐক্যের প্রতীক হতে হবে। এখানে ভিন্নমত থাকবে কিন্তু বিভেদ থাকবে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে কিন্তু বিশৃঙ্খলা থাকবে না।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে প্রেস ক্লাবের ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।তারা বলেন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জাহিদুল করিম কচি বলেন,প্রেস ক্লাবের উন্নয়ন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।তিনি সকলের মতামত নিয়ে গঠনতন্ত্রের আলোকে কার্যক্রম পরিচালনার আশ্বাস দেন। সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন,প্রেস ক্লাবের ঐতিহাসিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন। ইফতার মাহফিলটি শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং এটি ছিল পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার, ঐক্য পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা,গণতান্ত্রিক চর্চা ও ইতিহাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রেস ক্লাব তার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদায় ফিরে আসবে।বার্তা প্রেরক
ফারুক আবদুল্লাহ
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব।



