ঢাকা-লন্ডনে চাঞ্চল্য: মহিলা দল নেত্রীর বিরুদ্ধে বহুবিবাহ, জালিয়াতি ও বাড়ি দখলের গুরুতর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বিএনপির মহিলা দলের সহ-সভাপতি এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিক জেবা আমিনা আহমেদকে (জেবা আলগাজী) ঘিরে ঢাকা ও লন্ডনে ব্যাপক আইনি জটিলতা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রথম স্বামীকে আইনত তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে, লন্ডনে ব্যবসায়িক প্রতারণা, এবং ঢাকায় সাবেক স্বামী ও নিজ পরিবারের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী আবাসন ব্যবসায়ী ও তার দ্বিতীয় স্বামী মোকাররম হোসেন খান বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
প্রথম স্বামী বর্তমান থাকতেই দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, জেবা আমিনা ১৯৮৩ সালে লন্ডনে নিয়াজ বিন করিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম স্বামীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ ছাড়াই ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশে এসে রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি মোকাররম হোসেন খানের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন।
ঢাকা মেট্রো বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “যেহেতু পূর্বের বিবাহটি ব্রিটেনে আইনি প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত ছিল, তাই আইনি রেজিস্ট্রির মাধ্যমেই এর বিচ্ছেদ বাধ্যতামূলক। প্রথম স্বামী বর্তমান থাকা অবস্থায় বৈধ বিচ্ছেদ ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ এবং ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী অবৈধ।”
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। মোকাররম হোসেন খান প্রতারণার এই বিষয়টি জানতে পেরে ২০১৭ সালে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি মামলা (নং: ৩৪৬/১৭) দায়ের করেন এবং একই বছর তাদের বিচ্ছেদ হয়।
লন্ডনে ব্যবসায়িক জালিয়াতি ব্রিটিশ সরকারের দাপ্তরিক তথ্যানুযায়ী, জেবা আমিনা প্রথম স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে লন্ডনে ‘চিলড্রেন প্যারাডাইস (ইউকে)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল ঋণ ও ব্যবসায়িক অনিয়মের কারণে ব্রিটিশ সরকার আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ (লিকুইডেশন) করে দেয়। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’-এ তার এই আর্থিক বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল।
সাবেক স্বামীর ফ্ল্যাট দখল ও হামলার অভিযোগ দ্বিতীয় স্বামী মোকাররম হোসেন খান অভিযোগ করেছেন যে, বিচ্ছেদের পর জেবা আমিনা হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) আদেশের সুযোগ নিয়ে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এলাকার একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। এছাড়া, ভুয়া চুক্তিপত্র দাখিলের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে থানায় জিআর মামলাও (নং: ৩০(৮)১৭) রয়েছে।
মোকাররম হোসেন আরও গুরুতর অভিযোগ এনে বলেন, গত ২৭ জুন ঈদুল আজহার ছুটিতে তিনি সপরিবারে দেশের বাইরে থাকাকালীন জেবা আমিনার নির্দেশে ১০-১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল তার বারিধারার বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা (নং: ৩৫১৬/২৫) দায়ের করা হয়েছে, যার পুলিশি প্রতিবেদনও দাখিল হয়েছে।
পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ শুধু সাবেক স্বামীই নন, নিজ পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও উঠেছে এই নেত্রীর বিরুদ্ধে। গুলশান-২ এর ১০৮ নম্বর রোডে অবস্থিত পৈতৃক সম্পত্তি ‘কনকর্ড আতিয়া’-তে তার তিন বোন এবং প্রয়াত ভাইয়ের দুই এতিম সন্তানের ন্যায্য অংশ বুঝিয়ে না দিয়ে তিনি গত ১৫ বছর ধরে একাই পুরো ভবনের নিয়ন্ত্রণ ও ভাড়ার অর্থ ভোগ করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, একই ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্তের বক্তব্য এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা দলের সহ-সভাপতি জেবা আমিনা আহমেদ (জেবা আমিনা আলগাজী) বলেন, “প্রথম স্বামীর সঙ্গে মৌখিক তালাকের মাধ্যমেই আমার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে কোনো নারীর তিন ইদ্দত পার হলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন।”
তিনি আরও জানান, প্রথমে মৌখিক তালাক হলেও পরে ২০০৭ সালে লন্ডনের আদালতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিভোর্স সম্পন্ন হয় এবং সম্পদের অংশ পেতে দায়ের করা মামলাটিও ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। লন্ডনে কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, “কোম্পানি দেউলিয়া হয়নি, ব্রিটিশ সরকার এটিকে লিকুইডেশন করেছিল।” এছাড়া তার বিরুদ্ধে ওঠা দখল ও অন্যান্য সব অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।



